মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রে কী পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে

Nov 06, 2017 04:31 pm
প্রফেসর অলিভিয়ের রয়

ইরাক এখন সহিংসতা ও বর্বরতার পীঠস্থান। এই পরিস্থিতিতে শিয়া-সুন্নি সম্পর্ক, আঞ্চলিক যুদ্ধের বিস্তৃতির শঙ্কা, মধ্যপ্রাচ্যের সীমান্তগুলোতে পরিবর্তনের সম্ভাবনা ইত্যাদি নিয়ে বলেছেন প্রফেসর অলিভিয়ের রয়। তিনি ইতালির ইউরোপিয়ান ইউনির্ভাসিটি ইনস্টিটিউটের শিক্ষক এবং ‘পলিটিক্যাল ইসলাম’ সম্পর্কে বিশেষ সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আইজ্যাক চোটিনার। ইন্টারনেটে প্রাপ্ত এই সাক্ষাৎকার অনুবাদ করেছেন মীযানুল করীম।

আইজ্যাক চোটিনার : ‘ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড সিরিয়া’ (আইসিস)-কে একটা গ্রুপ হিসেবে কেমন মনে করেন? মুসলমানদের অন্যান্য সশস্ত্র গ্রুপ থেকে এটাকে কতটা আলাদা ধরনের বলে মনে হয়?
অলিভিয়ার রয় : আইসিস হচ্ছে আলকায়েদা থেকে জন্ম নেয়া একটি সংগঠন। তাই প্রথমেই বলা দরকার, আইসিস বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত একটি আন্তর্জাতিক আন্দোলনের অংশ। স্থানীয় সমাজে এর শেকড় গভীরে প্রোথিত নয়। এর কোনো ‘জাতীয়’ প্রকল্পও নেই। অথচ হামাস, হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিন জিহাদ কিংবা শিয়াদের র‌্যাডিকেল আন্দোলনগুলো জাতীয় পর্যায়ে তৎপর। আইসিসের বিদেশী স্বেচ্ছাসেবী সৈন্যদের অনেকেই আরবিতে কথা বলে না। ইরাকের স্থানীয় সমাজের পরোয়াও করা করে না। আইসিসি শরিয়ার কথা বলে; কিন্তু সিভিল সোসাইটি গড়ার কথা বলছে না। আইসিসি জঙ্গিদের একটি বাহিনী। এটি রাজনৈতিক দল কিংবা সামাজিক আন্দোলন নয়। আইসিস সফল হচ্ছে। কারণ, অন্যরা ব্যর্থ হয়েছে। তবে অন্যান্য ক্ষেত্রে যা ঘটেছে, তা ঘটবে ইরাকেও। সেটা হলো, আইসিসি পাল্টা আঘাত বা বাধার সম্মুখীন হবে নাগরিকদের পক্ষ থেকে। ফাল্লুজায় এমনটা ঘটেছিল। আবার নতুন একটা বিষয় দেখা যাচ্ছে। তা হচ্ছে, আলকায়েদা ও আইসিসের কিছু নেতা জঙ্গি আন্তর্জাতিক গ্রুপটিকে স্থানীয় একটি শক্তিতে রূপান্তরিত করার প্রয়োজন উপলব্ধি করছেন বলে মনে হয়। এভাবে তারা ‘মুক্ত এলাকা’গুলোতে প্রশাসন পরিচালনার সক্ষমতা অর্জন করতে চান। তবে সন্দেহ হয়, আইসিস এই যোগ্যতা হাসিল করতে পারবে কি না কিংবা কার্যকর রাজনৈতিক সংগঠন হয়ে ওঠার মতো সময় পাবে কি না। ওদের যে রিক্রুটমেন্ট কৌশল এবং বিশ্বজীবন যে আদর্শের তারা প্রবক্তা, তার সাথে এসব খাপ খায় না।


প্রশ্ন : ইরাক সম্পর্কে আপনি কতটা হতাশ?
উত্তর : মনে হয়, ‘জিহাদি’দের হামলা প্রতিহত হবে। মালিকি সরকার যে এটা করবে, তা নয়। শিয়া ও কুর্দিরা পাল্টা আঘাত হানবে। কেননা উভয়েই জানে, তাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার পরই তারা এখন লড়ছে। তারা বুঝতে পেরেছে, প্রতিপক্ষ তাদের নির্মূল করে দেয়ার স্বপ্ন দেখে। শিয়া ও কুর্দি মিলে ইরাকে সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং তারা লড়বে বৈ কি। তবে বাগদাদ সরকারের বাহিনী নয়, মূল শক্তি হবে কুর্দি বাহিনী এবং শিয়া ধর্মীয় নেতার লোকজন। এই নেতা সবার মতের প্রতিধ্বনি করেছেন। শিয়ারা কুর্দিস্তানের কার্যত স্বাধীনতাকে মেনে নেবে। তারা কুর্দিদের দখল থেকে কিরকুক উদ্ধারের জন্য লড়াই করবে না। সুন্নিরা ইরাকের কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে পারবে না। তাদের অন্তর্ভুক্ত জিহাদি, বাথ পার্টি এবং গোত্রপতিদের মধ্যে বিভেদ ও উত্তেজনা দেখা দেবে। শিয়ারা শাসন চালাত ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলে। সমস্যা বাগদাদ নিয়ে। মনে হয় না যে, কেন্দ্রে কোনো শক্তিশালী সরকার ক্ষমতায় আসবে। এসব মিলিয়ে বড়জোর একটি ঢিলেঢালা ফেডারেশন গঠিত হবে শিয়া-সুন্নি-কুর্দি সমবায়ে। অন্যথায় মন্দ যা ঘটতে পারে, তা হবে দেশটির তিনটি খণ্ডে বিভক্ত হয়ে যাওয়া।


প্রশ্ন : মধ্যপ্রাচ্যের সীমানাগুলো কিভাবে বদলে যেতে পারে বলে মনে করেন?
উত্তর : ভূখণ্ডের দিক দিয়ে পরিবর্তনের সত্যিই সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। অবশ্য কুর্দিরা এবং কিছু ইসরাইলি ছাড়া কেউ এমন পরিবর্তনের পক্ষে ওকালতি করেনি। তবে পরিহাস হলো, যারা এই পরিবর্তন ঘটিয়ে দিচ্ছে, ওরা কিন্তু এসব লোক নয়, যারা এটা চাচ্ছে।
এই পরিবর্তনের পেছনে প্রধান কারণ, নতুন নতুন শক্তির আবির্ভাব নয়, বরং পুরনো জাতীয় কাঠামোর পতনই এ জন্য মূলত দায়ী। মধ্যপ্রাচ্যে কৌশলগত বিভাজনরেখা প্রশস্ত হচ্ছে, যার বহিঃপ্রকাশ শিয়া-সুন্নি বিরোধ। এটাই হবে সীমানা রদবদলের বড় কারণ।
প্রথমে যা ঘটবে, তা হলো ইরাকের কুর্দিদের স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠা। ইরাক রাষ্ট্রের পতনেই এর উত্থান ঘটবে। সিরিয়াও ধসে পড়তে পারে। তবে ইরাকি কুর্দিস্তান ছাড়া আমরা আর কোনো জাতিরাষ্ট্র দেখব না যার সুনির্দিষ্ট সীমান্ত থাকবে। এমন দেশ গঠিত হতে পারে যা হবে পরিবর্তনশীল সীমান্ত সংবলিত অনির্দিষ্ট প্রভাব নয়। এখনকার জাতিরাষ্ট্রগুলোর পতন আন্তর্জাতিক সীমারেখাকে দুর্বল করে দেবে; নতুন সীমানা নির্ধারিত না হলেও। ইরান-ইরাক সীমান্ত এবং তুরস্কের সাথে এর দক্ষিণ দিকের প্রতিবেশীদের সীমান্ত বাস্তবে উন্মুক্ত হয়ে যাবে। তখন পণ্য, মানুষ আর অস্ত্রশস্ত্র আরো অবাধে এ দেশ থেকে ও দেশে চলাচল করবে।


প্রশ্ন : সুন্নি-শিয়া বিভাজন আরো তীব্র হবে বলে মনে করেন কি? আগে কি কখনো এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল?
উত্তর : এই বিভেদের সাথে ধর্মের সম্পর্ক খুব সামান্য। ইতিহাসে শিয়া-সুন্নি বিরোধ কদাচিৎ ভূকৌশলগত ইস্যুতে পরিণত হয়েছিল। এর ব্যতিক্রম হলো, ষোড়শ শতাব্দীতে ইরানের মানুষ শিয়া মতবাদে দীক্ষা নেয়ার ঘটনা। ইরানের ইসলামি বিপ্লব হওয়া পর্যন্ত বিংশ শতাব্দীতে এই বিভাজন পরিলক্ষিত হয়নি। ওই বিপ্লব জঙ্গি শিয়াবাদ হিসেবে প্রতীয়মান হওয়ায় এবং এর জের ধরে সুন্নিদের একটি ুদ্র অংশ (কথিত সালাফিরা) ধর্মীয় র‌্যাডিকেলের রূপ নেয়ায় শিয়া-সুন্নি বিভেদ সৃষ্টি হয়। সৌদি আরব সালাফিদের প্রেরণা দিয়েছে ধর্মীয় কারণে এবং আফগানিস্তান, উপসাগরীয় অঞ্চল ও ইরাকে ইরানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নস্যাৎ করার লক্ষ্যে। এই বিভেদ ও বিষাদ বাড়ছে। কারণ, বাড়ছে পারস্পরিক অবিশ্বাস। উপসাগরীয় এলাকায় শিয়াদের এখন পরিকল্পিতভাবেই দেখা হয় ইরানের ‘পঞ্চম বাহিনী’ বা এজেন্ট হিসেবে। অতীতে এটা ঘটেনি।
শিয়া-সুন্নি বিরোধ বর্তমানে ইরান বনাম সৌদি ‘প্রক্সি ওয়ার’। তবে শিয়া পক্ষ তুলনামূলকভাবে বেশি সংহত ও সমন্বিত (ইরান, হিজবুল্লাহ, সিরিয়ার আসাদ এবং কিছুটা হলেও ইরাকের মালিকি)। এর বিপরীতে সুন্নিরা চরমভাবে বিভক্ত এবং তাদের অভিন্ন লক্ষ্যও নেই।


ইরাকে মার্কিন অভিযানে সুন্নিরা ধ্বংস হয়ে গেছে, যারা ছিল ইরানের বিরুদ্ধে শক্ত দেয়ালের মতো। এর পরিণামে দু’টি ঘটনা ঘটছে। এক. ইরাক দেশটির মাঝে কুর্দিস্তানের কার্যত স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা এবং উত্তরাঞ্চলে সুন্নি অধ্যুষিত বিরাট এলাকা ইরাক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া। সিরিয়ার সীমান্তঘেঁষা এই এলাকাটি বাথ পার্টির প্রভাব থেকে জিহাদিদের প্রভাবের দিকে পরিবর্তিত হয়েছে। এদিকে সৌদি আরব মূলধারার সুন্নি সংগঠনের (যেমন, মুসলিম ব্রাদারহুড) পক্ষ না নিয়ে বরং তাদের ধ্বংস করতে চাচ্ছে। অথচ দেশটি কয়েক দশক ধরে অত্যন্ত র‌্যাডিকেল শক্তিগুলোকে সমর্থন দিয়ে এসেছে; যারা এখন পাকিস্তান, ইরাক ও সিরিয়ায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।
দেখা যাচ্ছে, ১৯১৮ থেকে ’৪৮ সালের মধ্যে গড়ে ওঠা রাষ্ট্র কাঠামোগুলোর পতনে সর্বাধিক লাভবান হবে ইরান। অথচ এ জন্য তাদের মাঠে নেমে লড়তে হয়েছে সামান্যই।


প্রশ্ন : সিরিয়াকে আন্তর্জাতিক প্রয়াসে আরো আগেই নিয়ন্ত্রণ করে কি ইরাকের চলমান সহিংসতা প্রতিরোধ করা সম্ভব হতো?
উত্তর : এটা স্পষ্ট যে, আইসিসের তৎপরতা ইরাকের দিকে সম্প্রসারিত হয়েছে সিরিয়া থেকেই। তবে আগে হোক কিংবা পরে, জিহাদিরা ইরাকের সুন্নি এলাকায় বিরাট কিছু একটা ঘটাতই। এর কারণ স্থানীয় জনগণের হতাশা। ফাল্লুজায় আমেরিকান সৈন্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার পর থেকে সুন্নিদের ইরাকের নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার সাথে খাপ খাইয়ে নেয়ার জন্য কিছুই করা হলো না।
শুরু থেকেই যে সমস্যা, তা হচ্ছে সিরিয়ায় কী পদক্ষেপ নেয়া হবে, তার সিদ্ধান্ত নিতে না পারা। এ দিকে সময় যত গড়াচ্ছে, ততই বোঝা কঠিন হচ্ছে যে, কী করা যায় সিরিয়ার ব্যাপারে। এখন তো সিরিয়ার সঙ্ঘাত আন্তর্জাতিক রূপ নিয়েছে। অতএব এর সমাধানে আন্তর্জাতিক চুক্তি করাই বর্তমানে একমাত্র ইস্যু। এই চুক্তির ক্ষেত্রে ইরান হবে অন্যতম ‘প্রধান খেলোয়াড়।’ কিন্তু ইরানের সাথে আলোচনার বিষয়কে ইসরাইলে এবং মার্কিন কংগ্রেসে খুবই সমালোচনা করা হয়। অথচ এটা স্পষ্ট যে, সিরিয়ার রণাঙ্গন যত বড় হবে, ততই বেড়ে যাবে ইরানের ভূমিকা।


প্রশ্ন : ইরানের সাথে আলোচনা ছাড়া আর কী করা উচিত পাশ্চাত্যের?
উত্তর : পশ্চিমা জগত কী করা উচিত, তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। কী করা সম্ভব, সেটাই মূল বিষয়। সিরিয়া সঙ্কটের গোড়াতেই ভূমিকা পালনে অস্বীকৃতি এখন এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করাকে দিন দিন আরো কঠিন করে তুলছে। সবার আগে বিশেষ করে ইরানসহ এ অঞ্চলের প্রতি মনোযোগী হতে হবে। দ্বিতীয়ত, আইসিস বাহিনী প্রতিরোধের জন্য ইরাকি শিয়া ও কুর্দিদের সাথে সমন্বয় সাধন করা চাই। এ জন্য ইরাকে সৈন্য পাঠানোর কোনো দরকার নেই। তৃতীয় কাজ হলো, বাগদাদে মালিকির বিকল্প ব্যক্তিকে বসানোর কথা চিন্তা করা। আর শেষ কাজটি হচ্ছে, সিরিয়ায় প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ এড়িয়ে প্রতিপক্ষের ‘ভালো’ অংশটি চিহ্নিত করা। তবে আশির দশকে আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, এটা আসলেই একটা চ্যালেঞ্জ।


প্রশ্ন : কুর্দিদের ভূমিকা কিংবা ইরানের সম্পৃক্ততা এসব থেকে তুর্কিরা কী ফায়দা নিচ্ছে বলে আপনার মনে হয়?
উত্তর : তুর্কিরা তাদের ‘সক্রিয়, অথচ অসঙ্গতিপূর্ণ’ এমন পলিসির মাশুল দিচ্ছে। কুর্দি কর্তৃপক্ষের এবং ইরানের সাথে সহযোগিতা ছাড়া তাদের সামনে বিকল্প নেই। তুরস্কে জিহাদিদের প্রবেশ বন্ধ করার জন্যই এটা করতে হবে। তুরস্কের জন্য তা কোনো বড় ব্যাপার নয়। কারণ কুর্দি ও ইরানিদের সাথে তাদের ‘স্বাভাবিক’ কূটনৈতিক ও গোয়েন্দা সম্পর্ক রয়েছে।