বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের যৌন নিপীড়ন

Nov 05, 2017 03:27 pm
বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিমল সিন্ড্রোম


আলফাজ আনাম


দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যৌন হয়রানি নিয়ে গণমাধ্যমে খুব কমই খবর প্রকাশ হয়ে থাকে। আলোকিত মানুষ গড়ার কারিগরদের অন্ধকার দিক গণমাধ্যমগুলো বিভিন্ন কারণে প্রচারে আগ্রহ দেখায় না। এর মধ্যে একটি অন্যতম কারণ হলো যেসব শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছাত্রীদের যৌন নিপীড়ন ও হয়রানির অভিযোগ উঠেছে, তাদের প্রায় সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রগতিশীল শিক্ষক হিসেবে পরিচিত। আবার সাংবাদিকেরাও নিজেদের প্রগতিশীল শ্রেণীভুক্ত হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। ফলে এসব আলোকিত মানুষদের অন্ধকার দিকটি তারা জনসম্মুখে আনতে ততটা আগ্রহী নন। এই কুসিত রূপটি যখন ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে, তখন আলোর ভেতরে কালো দিকটি আরো বেশি চকচক করতে থাকে। তখন আর তা চাপা দেয়া যায় না, প্রকাশ হয়ে পড়ে।


 বিবিসি বাংলা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানি নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। বিবিসিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী জানান, বিভাগের এক শিক্ষক তার সাথে যৌন সম্পর্ক গড়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এই অভিযোগ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছেও পৌঁছেছে। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে এই ছাত্রী বিবিসিকে বলেন, ‘বিভিন্ন প্রসঙ্গ টেনে স্যার যে আচরণ করছিলেন তা আমি মানতে পারিনি, আমি চলে এসেছি। চলে আসার সময় তিনি জিজ্ঞেস করছিলেন, তা হলে পরীক্ষার খাতার কী হবে? আমি বলেছি, স্যার আপনার যা ইচ্ছা তাই দিয়েন।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়ের প্রক্টর আমজাদ হোসেন বিবিসিকে জানান, গত এক বছরে ২০টির মতো অভিযোগ তার কাছে এসেছে। তিনি আরো জানান, অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে শাস্তির বিধানও রয়েছে।


প্রশ্ন হলো, যৌন হয়রানি বা নিপীড়নের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের শাস্তি শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে হবে কেন? প্রচলিত আইনে কেন হবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বলে কি? যেকোনো যৌন হয়রানির জন্য প্রচলতি ফৌজদারি আইনে কঠোর শাস্তির বিধান থাকলেও কোনো বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের এমন শাস্তি হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এ ধরনের যৌন হয়রানির আরো অনেকঅভিযোগ উঠেছে। গত ১৫ সেপ্টেম্বর নাট্যকলা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের এক ছাত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগে ওই বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট। সব ধরনের শিক্ষাকার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। তবে ভুক্তভোগী ছাত্রীর সহপাঠীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে ওই শিক্ষকের স্থায়ী চাকরিচ্যুতির দাবি জানিয়ে আন্দোলনে নামেন। ১৫ দিন পর গঠন করা হয় তদন্ত কমিটি। কিন্তু এরপর আর কোনো খবর নেই। ট্যাবলয়েড দৈনিক মানবজমিন ঢাকা বিশবিদ্যালয়ের শিক্ষকদের যৌন নিপীড়ন নিয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ তা বোঝার জন্য আমরা সেই প্রতিবেদনের অংশবিশেষ তুলে ধরছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক মাহমুদুর রহমান বাহলুল। ২০১০ সাল থেকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ওই বিভাগের দুই ছাত্রীর সাথে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন। ২০১৩ সালে অন্য মেয়েকে বিয়ে করতে গেলে বেরিয়ে আসে থলের বিড়াল। ফাঁস হয়ে যায় লম্পট ওই শিক্ষকের অপকর্ম। ভিসি বরাবর অভিযোগ করেন ওই দুই ছাত্রী। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গঠিত হয় তদন্ত কমিটি। এক বছরের জন্য তাকে অব্যাহতি দেয়া হয় বিভাগের সব কর্মকাণ্ড থেকে। তদন্ত করে প্রমাণ পায় গঠিত কমিটি। সুপারিশ করে সর্বোচ্চ শাস্তির। কিন্তু এখানেই শেষ। রাজনৈতিক কারণে তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। প্রমোশন দিয়ে ওই শিক্ষককে করা হয় সহকারী প্রক্টর।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের শিক্ষক এ টি এম ফখরুল ইসলাম। তার বিভাগের তৃতীয় বর্ষের এক ছাত্রীর সাথে একই ছাদের নিচে বসবাস করেন দীর্ঘ দিন। বিষয়টি গড়ায় শিক্ষকের পরিবার পর্যন্ত। হাতেনাতে ধরাও পড়েন তারা। ইট দিয়ে ছাত্রীর মাথা ফাটান। পরে কিছু দিন শিক্ষক এবং কথিত দ্বিতীয় স্ত্রী পালিয়ে থাকেন। ওই শিক্ষক আবার ক্যাম্পাসে এলেও ওই ছাত্রীকে আর দেখা যায়নি। তদন্ত কমিটি হলেও এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।


একই অভিযোগ ওঠে ফার্সি বিভাগের শিক্ষক ড. আবু মূসা আরিফ বিল্লাহর বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী কলা ভবনের চতুর্থতলায় কথা বলার সময় এক ছাত্রীকে হঠাৎ জড়িয়ে ধরেন তিনি। এরপর ওই ছাত্রীর শরীরের স্পর্শকাতর স্থানে হাত দিতে থাকেন। এ সময় অন্য ছাত্রীরা এসে তাকে উদ্ধার করেন। লজ্জায় ওই ছাত্রী আর ক্যাম্পাসে আসেননি। ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি।
পরিসংখ্যান, প্রাণ পরিসংখ্যান ও তথ্য পরিসংখ্যান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. জাফর আহমেদ খানের বিরুদ্ধে পরকীয়া, নিপীড়ন ও যৌতুকের অভিযোগ আনেন তারই স্ত্রী। তিনি জাফরের বিরুদ্ধে একাধিক ছাত্রীর সাথে অনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে বলে অভিযোগ করেন।
২০০৯ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক গিয়াস উদ্দিন মোল্লার বিরুদ্ধে এক ছাত্রী যৌন হয়রানির অভিযোগ আনেন। এরপর ওই শিক্ষককে এক বছর একাডেমিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়।


২০১০ সালে ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের তখনকার চেয়ারম্যান অধ্যাপক আফজাল হোসেনের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। ২০১১ সালে উর্দু বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. ইসরাফিলের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তোলেন এক শিক্ষার্থী। ২০০৯ সালে ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের শিক্ষক মুমিত আল রশিদের বিরুদ্ধে ওই বিভাগেরই এক ছাত্রী তার স্ত্রী দাবি করেন। একইভাবে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক এমরান হোসেন, মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের মাহমুদ হাসান, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের আমানুল্লাহ ফেরদৌস, ফিন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক মো. সালাহউদ্দিন চৌধুরী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক এস এম মফিজুর রহমান, মো: জাকারিয়া, মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগে তদন্ত কমিটি হলেও রিপোর্ট অপ্রকাশিত রয়ে গেছে। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও প্রভাবশালী মহলের চাপে অনেক সময় প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও লঘু শাস্তি দিয়ে ছেড়ে দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। (মানবজমিন ২৮ অক্টোবর ২০১৪)


এ ধরনের ছাত্রী নিপীড়নের ঘটনা যে শুধু ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে ঘটছে, তা নয়, দেশের অন্য বিশ^বিদ্যালয়গুলোতেও এমন ঘটনা ঘটেছে। সম্প্রতি রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের একজন ‘প্রগতিশীল’ শিক্ষক সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত হয়েছেন। ড. শফিউল ইসলাম লিলন নামে এই শিক্ষক নিহত হওয়ার পর তার বাড়ি থেকে এক ছাত্রীকে উদ্ধার করা হয়। এই শিক্ষক ছাত্রীকে বাড়িতে তালাবদ্ধ রেখে বাইরে যান। সে সময় তিনি খুন হন। ওই ছাত্রী শিক্ষকের বাড়িতে অবরুদ্ধ অবস্থায় মা-বাবা ও তার মামাকে ফোন করেন। এরপর খবর পেয়ে তাকে উদ্ধার করতে তারা রাজশাহী পৌঁছেন। পুলিশের সহায়তায় তাকে উদ্ধার করা হয়।


এই হত্যাকাণ্ডের পর গণমাধ্যমে এমন প্রচারণা চালানো হয় যে, জঙ্গি বা ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। ঘটনার পর ১১ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এর মধ্যে একটি কলেজের একজন অধ্যক্ষও আছেন। এই অধ্যক্ষকে আটক করা হয় এজন্য যে, সম্ভবত তার কলেজের নাম ইসলামিয়া কলেজ। যেহেতু ইসলাম শব্দ আছে তাই আটক করতে কোনো তদন্তের প্রয়োজন হয়নি। পরে র‌্যাবের তদন্তে জানা গেল, এই শিক্ষক বিশ^বিদ্যালয়ের একজন নারী সেকশন অফিসারের সাথে অশোভন আচরণ করেছিলেন। তার স্বামী ক্ষুব্ধ হয়ে তার ওপর হামলা চালালে তিনি নিহত হন।


রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের এই শিক্ষক হত্যার সাথে যে নারীঘটিত সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে তার ব্যক্তিগত জীবনের তথ্য থেকে অনুমান করা যায়। কিন্তু প্রচারমাধ্যম আর পুলিশের চোখ রাজনীতিতে। ড. লিলনের প্রথম স্ত্রী জলি অতিরিক্ত ঘুমের বড়ি খেয়ে আত্মহত্যা করেন। জলি ছিলেন লিলনের আপন খালাতো বোন। দ্বিতীয় স্ত্রী শিউলির সাথে কয়েক বছর আগে ছাড়াছাড়ি হয়েছে। সর্বশেষ স্ত্রী স্বপ্নার সাথেও বিচ্ছেদ হয়। এখানে একজন মৃতব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আলোচনা উদ্দেশ্য নয়। ব্যক্তিগত বা পারিবারিক কারণে বিয়ে বিচ্ছেদ হতেই পারে। কিন্তু তাই বলে তিনজন! এর মধ্যে একজন আবার আত্মহত্যা করেছেন। একজন নারী কোন পরিস্থিতিতে আত্মহত্যা করতে পারেন তা অনুমান করা কঠিন বিষয় নয়।


এই শিক্ষক যে ছাত্রীকে বাড়িতে আটকে রেখেছিলেন সেই ছাত্রী এই শিক্ষকের অধীনে থিসিস করছিলেন। ছাত্রীটিকে কেন রাতে শিক্ষকের বাসায় থাকতে হলো। আর যদি থেকেও থাকে তাহলে কেন তাকে তালাবদ্ধ করে রাখা হলো? আমাদের গণমাধ্যমে এসব প্রশ্ন তোলা হয়নি। কারণ নিহত এই শিক্ষক যেহেতু একজন প্রগতিশীল ব্যক্তি, তাই এসব প্রশ্ন তোলা হচ্ছে না। গ্রামে কোনো অল্প শিক্ষিত মাদরাসার শিক্ষক বা মসজিদের ইমাম যদি অল্পবয়সী কোনো মেয়েকে বিয়ে পড়িয়ে থাকেন সেজন্য জেলে যেতে হচ্ছে। গণমাধ্যমে ফতোয়াবাজি বা নিপীড়ক হিসেবে বিশাল খবর হচ্ছে। বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা জঘন্য উপায়ে নারী নির্যাতন চালালেও নিশ্চুপ নারীবাদীরা, তেমনি নিশ্চুপ গণমাধ্যম।
রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুলে পরিমল জয়ধর নামে এক শিক্ষক প্রাইভেট পড়ানোর নামে ছাত্রীদের সাথে যৌন সম্পর্ক গড়ে তোলেন। এ বিষয়টি জানাজানি হলে স্কুলের ছাত্রী-অভিভাবকেরা তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন। শেষ পর্যন্ত আন্দোলনের মুখে পরিমল জয়ধরকে গ্রেফতার করা হয়। প্রচলিত আইনে তার বিচার হয়। এখনো সে জেলে আছে।

ভিকারুন নিসা স্কুলের একজন পরিমলকে আইনের আওতায় আনা গেলেও দেশের বিশ^বিদ্যালয়গুলোতে আরো অনেক পরিমল জয়ধর এখনো রয়ে গেছেন। এরা সমাজে এতটাই প্রভাবশালী যে, এদের বিরুদ্ধে ছাত্রীরা হয়তো কথা বলার সাহস পান না। আর এদের পাশে রয়েছে বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন। ক্ষমতাসীনদের সাথে এই শিক্ষকদের থাকে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। নিপীড়নের শিকার ছাত্রীরা এদের বিরুদ্ধে কথা বললে হয়তো তাকে আরো সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে। কিন্তু কাউকে-না-কাউকে তো কথা বলতে হবে। নারীবাদীরা যদি তথাকথিত মৌলবাদের বিরুদ্ধে লড়াই না করে মুখোশধারী পরিমলদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতেন, তাহলে বিশ^বিদ্যালয়ে অনেক নারী নির্যাতন ও সম্মানহানি থেকে রক্ষা পেতেন। কিন্তু তার কোনো লক্ষণ আমরা দেখছি না।