বিশ্বের আলোচিত নারী গোয়েন্দাদের শেষ পরিনতি

Oct 30, 2017 02:55 pm
যুদ্ধ শেষ হলে দক্ষিণ আফ্রিকায় জন্মগ্রহণকারী পিপ্পা


মূল : মার্টিন ফিলিপস
অনুবাদ : ঐশী পূর্ণতা

 

নারী যখন গুপ্তচর

নিউজিল্যান্ডের ওয়েস্ট অকল্যান্ডের এক বৃদ্ধাশ্রমে বসবাসরত পিপ্পা ডয়লে এত দিন হোমের অন্যদের চোখে তাদের মতোই সাধারণ একজন ছিলেন। ৯৩ বছর বয়স তার। মিষ্টি স্বভাবের মানুষ। মাথায় বরফের মতো সাদা চুল। পেনশন পান। চার সন্তানের জননী। এই তো, এর মধ্যে ‘অসাধারণত্বের’ আর কী থাকতে পারে!
গোল বাধল ২০১৪ সালের নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে এসে। ফ্রান্স সরকার হঠাৎ করে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক খেতাব লিজিয়ন অব অনারে ভূষিত করল। তাও না হয় মেনে নেয়া যেত, কিন্তু যে কারণে তার এ সম্মান, তা শুনে হোমের বাসিন্দারা যেন ঢোক গেলার ক্ষমতাই হারিয়ে ফেলল। পিপ্পা খেতাবটি পেয়েছেন ১৯৪৪ সালে অধিকৃত নরম্যান্ডিতে ব্রিটিশ গুপ্তচর হিসেবে দুর্ধর্ষ ভূমিকা রাখার জন্য। নিজের এই গোপন ও গৌরবময় অতীত নিয়ে তিনি কখনো একটি শব্দও বলেননি, এমনকি কখনো কোথাও এ বিষয়ে কথা উঠলেও সন্তর্পণে এড়িয়ে গেছেন সম্ভ্রান্ত এই নারী।
পিপ্পা ডয়লে বা মিসেস ডয়লের আসল নাম ফিলিস লেট্যুর। তার পিতা ছিলেন ফরাসি, মা ইংরেজ। পিপ্পার বয়স যখন খুব কম, তখনই তারা মারা যান। পিতা ও মাতার সুবাদে ফরাসি ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই অনর্গল কথা বলতে পারতেন পিপ্পা।
মাত্র ২০ বছর বয়সে ফ্লাইট মেকানিক হিসেবে প্রশিক্ষণ নেয়ার জন্য ব্রিটেনের উওম্যান’স অক্সিলিয়ারি এয়ারফোর্সে যোগ দেন পিপ্পা। ফরাসি ভাষায় দক্ষতা তাকে যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে খানিকটা এগিয়ে দেয়। আনআর্মড কমব্যাট, ওয়েপনস ড্রিল ও মোর্স কোড বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে তাকে পাঠিয়ে দেয়া হয় অধিকৃত ফ্রান্সে।
১৯৪২ সালে পিপ্পাকে পাঠানো হয় ফ্রান্সের অ্যাকুইটাইনে। তার বয়স যখন ২৩, তখন অর্থাৎ ১৯৪৪ সালের ১ মে তাকে প্যারাসুটে করে ফেলা হয় নরম্যান্ডিতে। এবার সে হয়ে যায় ১৪ বছর বয়সী একজন ফরাসি বালিকা। তার নাম পাউলেত। একটি সাইকেলে চড়ে অন্য সব ফরাসি মেয়ের মতো সেও দখলদার জার্মান সৈন্যদের কাছে সাবান বিক্রি করতে থাকে। জার্মান সৈন্যরা কল্পনাও করতে পারে না, এই ছোট মিষ্টি মেয়েটি আসলে একজন ব্রিটিশ স্পাই। সাবান বিক্রির ছদ্মাবরণে মেয়েটি ঘুরে ঘুরে দেখে নেয় দখলদার সৈন্যদের পজিশন ও মুভমেন্ট। তারপর তা জানিয়ে দেয় ফরাসি প্রতিরোধ যোদ্ধাদের, আর গোপন রেডিওর সাহায্যে খবর ট্রান্সমিট করে ব্রিটেনে।
এ সময় পিপ্পা থাকত বনের ভেতরে, যাচ্ছেতাই রকমের একটা কুঁড়েঘরে। বেঁচে থাকার জন্য ইঁদুর ধরে খেত আর ভেতরে ভেতরে কেবলই ভয়ে কাঁপত, যদি ধরা পড়ে যাই!
বছর ১৫ আগে নিজের জীবনের এই গোপন অধ্যায়টি পিপ্পা প্রথম বলেন তার সন্তানদের কাছে। ২০০৯ সালে নিউজিল্যান্ডের আর্মি নিউজ ম্যাগাজিনকে জানান কেন ও কিভাবে তিনি ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এসওই’র স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেছেন। পিপ্পা কোনো রাখঢাক না করেই জানান, নেহায়েত প্রতিশোধ নেয়ার উদ্দেশ্যেই তিনি এ কাজে জড়ান। কারণ, শৈশবে পিতৃ-মাতৃহীন পিপ্পাকে যে নারী মাতৃস্নেহে লালনপালন করেছিলেন, তার পিতাকে গুলি করে হত্যা করে জার্মানরা আর মাতাকে ধরে নিয়ে যায়। জার্মানদের হাতে বন্দী হয়ে তিনি আত্মহত্যা করেন। এর বদলা নিতেই পিপ্পা ব্রিটেনের পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তিতে নামেন।
স্পাই হলেও নারীসত্তাটি সতত সক্রিয় ছিল পিপ্পার ভেতরে। একটি ঘটনার মধ্য দিয়ে সেটি স্পষ্ট হয়। একবার তার পাঠানো বার্তার সূত্র ধরে একটি জার্মানভাষী এলাকায় গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। পরে পিপ্পা জানতে পারেন, ওই হামলায় এক জার্মান নারী ও দু’টি শিশুও নিহত হয়েছে। শুনে বিষাদে ছেয়ে যায় তার মন। তিনি ভাবতে থাকেন, এই মৃত্যুর জন্য তো পরোক্ষভাবে আমিও দায়ী। পরে তিনি তাদের শেষকৃত্যে অংশ নেন।
যুদ্ধ শেষ হলে দক্ষিণ আফ্রিকায় জন্মগ্রহণকারী পিপ্পা এক অস্ট্রেলিয়ান ইঞ্জিনিয়ারকে বিয়ে করেন এবং কখনো ফিজি, কখনো অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করতে থাকেন। পরে নিউজিল্যান্ডে স্থায়ী হন।


মাতা হারি

নারী স্পাইদের কথা বলতে গেলে সবার আগে যে নামটি আসে সেটি হলো মাতা হারি। এই ডাচ নৃত্যপটীয়সী দেহজীবী নারীটির আসল নাম মার্গারেখা জেলে।
মাতা হারির নৃত্যশিল্পী জীবন শুরু হয় প্যারিসে; ১৯০৫ সালে। প্রায়-নগ্ন নৃত্য পরিবেশন করতেন তিনি। ফলে প্যারিস ছাড়িয়ে গোটা ইউরোপে তার ‘সুনাম’ ছড়িয়ে পড়তে খুব বেশি দেরি হয়নি। এই সুবাদে সামরিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনের অসংখ্য হোমড়াচোমড়ার সাথেও তার দহরম-মহরম প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯১৪ সালে যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়, মাতা হারি তখন ইউরোপ সফরে ব্যস্ত। নানা দেশে নৃত্য প্রদর্শন এবং অনুষ্ঠান শেষে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের শয্যাসঙ্গিনী হওয়া বিষয়টি চোখ এড়ায় না ফ্রান্সের। তারা তাকে ‘কাজে লাগানোর’ সিদ্ধান্ত নেয়। সিদ্ধান্ত অনুসারে জার্মানি-অধিকৃত বেলজিয়ামে ফ্রান্সের স্পাই হিসেবে কাজ পায় মাতা হারি। একপর্যায়ে জার্মানরাও তাকে স্পাই হতে সাধে। বুদ্ধিমতী মাতা হারি তাতেও ‘না’ করে না। সে হয়ে যায় ডাবল এজেন্ট। জার্মানদের তৎপরতার খবর জানায় ফ্রান্সকে, আর ফ্রান্সের খবর জার্মানিকে।
একপর্যায়ে বিষয়টি জানাজানি হয়ে যায়। ব্রিটেনের একজন স্পাই তার কর্তৃপক্ষকে জানায় মাতা হারির দ্বিচারিণী ভূমিকার কথা। সেখান থেকে জেনে যায় ফ্রান্স। ১৯১৭ সালের গোড়ার দিকে প্যারিসে গ্রেফতার করা হয় মাতা হারিকে। সে যথারীতি অপরাধ অস্বীকার এবং নিজেকে নির্দোষ দাবি করে। কিন্তু তাতে কাজ হয় না। তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে দোষী সাব্যস্ত হয় মাতা হারি। ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলি করে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার রায় হয়।
তবে দুরন্ত সাহস ছিল মাতা হারির এ কথা স্বীকার করতেই হবে। ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলি করে মারার আগে সে তার চোখ কাপড় দিয়ে বাঁধতে দিতে অস্বীকার করে এবং যে সৈনিক তাকে গুলি করবে, তার চোখে চোখ রেখে মরতে চায়।

 

এডিথ শাভেল

এডিথ শাভেলের জন্ম ইংল্যান্ডে, কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধ যখন শুরু হয় তখন তিনি বেলজিয়ামে একটি নার্সিং স্কুলে কাজ করছেন।
হাসপাতালের মেট্রন হিসেবে নিজ দায়িত্ব সুচারুরূপে পালন করার পাশাপাশি তিনি অত্যন্ত গোপনে আরো একটি কাজ করতেন। কমপক্ষে ২০০ ইংরেজ, ফরাসি ও বেলজিয়ান সৈন্যকে জার্মানদের হাত থেকে পালাতে সাহায্য করেন।
দখলদার বাহিনী এক সময় এডিথের এই গোপন কার্যক্রমের খবরটি জেনে যায়। তারা তাকে গ্রেফতার ও বিচারের মুখোমুখি করে। তবে স্পাই হিসেবে নয়, বিদেশী সৈন্যদের সহযোগী হিসেবেই তার বিচার এবং ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের রায় হয়।
তৎকালীন নিরপেক্ষ দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও স্পেন তাকে ক্ষমা প্রদর্শনের আবেদন জানায়। কিন্তু জার্মানরা তাতে কর্ণপাত করে না। তারা ১৯১৫ সালের অক্টোবরে ফায়ারিং স্কোয়াডে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগে তাকে তওবা পড়াতে যান এক পাদ্রি। এডিথ তাকে বলেন, কারো প্রতি আমার কোনো ঘৃণা বা তিক্ততা নেই।
এডিথকে ফায়ারিং স্কোয়াডের কাছে সমাহিত করা হয়। কিন্তু ব্রিটেন তাকে ভুলে যায়নি। বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে তার মৃতদেহ ইংল্যান্ডে এনে ওয়েস্টমিনিস্টার অ্যাবেতে শেষকৃত্যের আয়োজন করা হয়। তার সম্মানে সম্রাট পঞ্চম জর্জ এতে যোগ দেন।

 

ভায়োলেট সজাবো

ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এসওই’র এক সহকর্মী তার সম্বন্ধে বলেছিলেন, ‘আমাদের মধ্যে সবচেয়ে সাহসী।’ আসলেও তাই। তার কীর্তির ছায়া অবলম্বনে পরে একটি চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়।
তিনি হচ্ছেন ভায়োলেট রেইন। তার জন্ম ফ্রান্সে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর আগেই ভায়োলেট লন্ডন চলে যান এবং ফ্রি ফ্রেন্স ফোর্সেসের অফিসার এতিয়েনে সজাবো-কে বিয়ে করেন। ১৯৪২ সালে তাদের ঘরে আসে প্রথম সন্তান তানিয়া। এর পরপরই যুদ্ধে নিহত হন স্বামী এতিয়েনে। এ ঘটনায় প্রতিশোধের আগুন জ্বলে ওঠে ভায়োলেটের মনে। স্বামী হত্যার বদলা নিতে তিনি যোগ দেন ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এসওই-তে।
যোগ দিয়েই কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন ভায়োলেট। নরম্যান্ডিতে ফরাসি প্রতিরোধ আন্দোলন তখন ছিন্নভিন্ন অবস্থায়। ভায়োলেট তাকে সুসংহত করেন। ১৯৪৩ সালে তার নেতৃত্বে যোদ্ধারা সড়ক ও রেলপথে অন্তর্ঘাতমূলক অভিযান চালাতে থাকে। পাশাপাশি কোন জার্মান অবস্থানে বোমা ফেলতে হবে, তাও ব্রিটিশদের জানিয়ে দেয়।
এক বছর পর একদিন তিনি তার কয়েকজন সহকর্মীকে নিয়ে গাড়িতে করে লিকোজে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ জার্মান সৈন্যরা তাদের গাড়িটিকে থামার নির্দেশ দেয়। বাধা পেয়ে গ্রুপ লিডার ও ভায়োলেট পথ পরিষ্কার করার জন্য গুলি ছুড়তে শুরু করে।
এক পর্যায়ে যোদ্ধাদের পালানোর সুবিধার্থে কভার দেয়ার (শত্রুকে ঠেকিয়ে রাখা) উদ্দেশ্যে স্টেনগান থেকে জার্মান সৈন্যদের উদ্দেশে অবিরাম গুলি ছুড়তে থাকে ভায়োলেট। ৬৪ রাউন্ড বর্ষণ শেষে গুলি ফুরিয়ে যায়। জার্মান সৈন্যদের হাতে ধরা পড়েন তিনি।
তাকে গেস্টাপো সদর দফতরে নিয়ে প্রচণ্ড নির্যাতন চালানো হয়। কিন্তু তার মুখ থেকে একটি কথাও বের করতে পারেনি ওরা। এরপর তাকে পাঠিয়ে দেয়া হয় কুখ্যাত র‌্যাভেন্সব্রুক কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে। সেখানেই ১৯৪৫ সালের জানুয়ারি মাসে ভায়োলেটের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তার বয়স তখন মাত্র ২৩।
ব্রিটিশ রাজার পক্ষ থেকে তাকে মরণোত্তর জর্জ ক্রস দেয়া হয়। মায়ের পক্ষ থেকে তা গ্রহণ করেন কন্যা তানিয়া।
আন্দ্রে বরেল

ফরাসিকন্যা আন্দ্রে বরেল ১৯৪২ সালে ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এসওই-তে যোগ দিলেও এর আগে থেকেই তিনি মিত্রশক্তির যুদ্ধ কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়েন। তিনি ও তার এক বন্ধু মিত্রশক্তির একটি ভূপাতিত বিমানের পাইলটকে জার্মান-অধিকৃত ফ্রান্স থেকে একটি গোপন রেলপথে স্পেনে পালিয়ে যেতে সহায়তা করেন। ১৯৪০ সালে রেলপথটির খবর জানাজানি হয়ে যায় এবং আন্দ্রে পর্তুগাল পালিয়ে যান।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল গোয়েন্দা সংস্থা এসওই গঠন করলে যে ক’জন নারী সর্বপ্রথম তাতে যোগ দিয়ে ১৯৪২ সালের সেপ্টেম্বরে অধিকৃত ফ্রান্সে চলে আসেন, আন্দ্রে তাদের একজন।
১৯৪৩ সালের গোড়ার দিকে তিনি প্যারিসের লোকাল প্রসপার রেসিসট্যান্স নেটওয়ার্কের সেকেন্ড ইন কমান্ড নিযুক্ত। কিন্তু কে বা কারা বিশ্বাসঘাতকতা করলে আন্দ্রে তার তিন সহকর্মীসহ ধরা পড়ে যান। এর আগে তারা বিদ্যুৎকেন্দ্র ও অন্য আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় সফল হামলা চালাতে সক্ষম হন।
গ্রেফতারের পর গেস্টাপো অনেক নিপীড়ন চালিয়েও তাদের কাছ থেকে তথ্য আদায়ে ব্যর্থ হয়। ১৯৪৪ সালের মে মাসে আন্দ্রে এবং তার তিন সাহসী সহযোদ্ধাকে পুড়িয়ে মারার জন্য নিয়ে যাওয়া হয় নাৎসভেইলার-স্ট্রুথফ কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে। চুলায় তোলার আগে তাদের বিষাক্ত ইনজেকশন দিয়ে অজ্ঞান করে ফেলা হয়। কিন্তু আন্দ্রে অল্পক্ষণের মধ্যে জ্ঞান ফিরে পান এবং জল্লাদের হাত থেকে বাঁচতে লড়াই শুরু করে দেন। তিনি নখ দিয়ে জল্লাদের মুখ খামচে দেন। একপর্যায়ে হেরে যান এবং ওরা তাকে জীবন্ত চুল্লিতে পুরে দেয়।

 

ন্যান্সি ওয়েক

ন্যান্সি ওয়েকের জন্ম নিউজিল্যান্ডে। তিনি ছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সবচেতে উজ্জ্বল নারী সৈনিকদের একজন। গেস্টাপো তাকে বারবার ধরার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। অদ্ভুত কৌশলে ধরা পড়ার হাত থেকে বেঁচে যান তিনি। তার এই পলায়ন কুশলতার স্বীকৃতি মিলে গেস্টাপোর বিশেষণে। গেস্টাপো তাকে ডাকত ‘সাদা ইঁদুর’ বলে। ওরা তার মাথার মূল্য ধার্য করেছিল ৫০ লাখ ফ্রাঁ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর আগে ন্যান্সি ছিলেন সাংবাদিক। কাজ করতেন ইউরোপে। বিয়ে করেছিলেন এক ফরাসি শিল্পপতিকে। কিন্তু জার্মানি যখন ফ্রান্স দখল করে নেয়, তখন ন্যান্সি যোগ দেন প্রতিরোধ লড়াইয়ে। ব্রিটিশ বিমান সেনাদের পালিয়ে যেতে সাহায্য করতেন তিনি।
১৯৪০ সালে স্বামীকে অধিকৃত ফ্রান্সে ফেলে রেখেই ন্যান্সি পালিয়ে ব্রিটেনে চলে যান এবং পরে এসওই-তে যোগ দেন। ১৯৪৪ সালে তাকে ফ্রান্সে ফেরত পাঠানো হয়। দায়িত্ব দেয়া হয় স্থানীয় প্রতিরোধ যোদ্ধাদের সুসংগঠিত করার। তিনি সুচারুরূপে সেই দায়িত্ব পালন করে গড়ে তোলেন সাত হাজার যোদ্ধার একটি দল। এ দলটি প্রায় সময় গেস্টাপোদের ওপর হামলা চালাত।
এ সময় একবার তিনি ৭১ ঘণ্টা সাইকেল চালিয়ে ৩০০ মাইল পথ পাড়ি দেন। পথিমধ্যে অতিক্রম করেন অনেকগুলো জার্মান চেকপোস্টও।
আরেকবার এক জার্মান সেনাঘাঁটিতে অভিযান চালাতে যান তারা। যোদ্ধাদের দেখেই অ্যালার্ম বাজাতে যায় জার্মান সেন্ট্রি। কিন্তু তার আগেই খালি হাতে তাকে হত্যা করেন ন্যান্সি ওয়েক। তার এক সহযোদ্ধা তাই বলেন, যুদ্ধ শুরুর আগ পর্যন্ত সে ছিল আমার দেখা সবচেয়ে নারীসুলভ মহিলা। কিন্তু তার পর সে হয়ে গেল পাঁচজন পুরুষের সমান।
যুদ্ধ শেষের পর সবচেয়ে খারাপ খবরটি পেলেন ন্যান্সি। তার স্বামীকে গেস্টাপোর এজেন্টরা গুলি করে মেরেছে। কারণ, তিনি ওদেরকে তার বিষয়ে কোনো খোঁজখবরই দেননি।
ন্যান্সি তার কৃতিত্বের জন্য ইউএস প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেলসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ পদক লাভ করেন। ২০১১ সালে ৯৮ বছর বয়সে লন্ডনে তার মৃত্যু হয়।

 

সিসিলি পার্ল উইদারিংটন

সিসিলি জাতিতে ব্রিটিশ, কিন্তু জন্ম ফ্রান্সে হওয়ায় ফরাসি ভাষা বলতে পারতেন ওইদেশীয়দের মতোই।
নাৎসিরা ফ্রান্স দখল করলে সিসিলি পালিয়ে লন্ডন চলে আসেন এবং ১৯৪৩ সালের জুন মাসে এসওই-তে যোগ দেন। ১৫ সপ্তাহ পর তাকে ফের ফ্রান্সে পাঠানো হয়। তিনি কাজ করবেন কুরিয়ার হিসেবে এবং অস্ত্রপাচার ও গোয়েন্দাগিরিতে।
এ সময় ফরাসি প্রতেিরাধ যোদ্ধাদের একটি দল, রেস্টলার রেসিসট্যান্স মুভমেন্টের নেতা শত্রুর হাতে ধরা পড়লে তার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন সিসিলি। এ দলে ছিল দেড় হাজারেরও বেশি যোদ্ধা। সিসিলির নেতৃত্বে এ দলটির হাতে আনুমানিক এক হাজার জার্মান সৈন্য নিহত হয়। এ ছাড়া ফ্রান্সের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলীয় রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় ৮০০ বারেরও বেশি বিঘœ ঘটাতে সক্ষম হয় তারা।
জার্মানরা তাকে ধরার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। তারা সিসিলির মাথার মূল্য ধার্য করে ১০ লাখ ফ্রাঁ। একপর্যায়ে সিসিলি ও তার যোদ্ধাদের ওপর আক্রমণ চালায় দুই হাজার জার্মান সৈন্যের একটি দল। ১৪ ঘণ্টা যুদ্ধ চলে। এতে ৮৬ জন জার্মান সেনা এবং ২৪ জন প্রতিরোধ যোদ্ধা নিহত হয়। কিন্তু জার্মানরা সেবারও সিসিলির নাগাল পায়নি।
তবে তারা সিসিলিকে দেখেছিল নিজেদের লজ্জাজনক বিদায়বেলায়। হিটলারের ১৮ হাজার সৈন্যের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেছিলেন সিসিলি।
যুদ্ধশেষে সিসিলিকে মিলিটারি মেডেল দেয়ার সুপারিশ করা হলেও তা গ্রাহ্য করা হয়নি। কারণ, কোনো নারীকে এই পদক দেয়া হয় না। অবশ্য তিনি প্রথমে এমবিই এবং পরে সিবিই পান। ২০০৮ সালে ৯৩ বছর বয়সে ফ্রান্সে তার মৃত্যু হয়।
অডেটে চার্চিল

অডেটে এসওই-তে যোগ দেন ভুলক্রমে। তার যোগ দেয়ার কথা ছিল সামরিক বাহিনীর অন্য একটি শাখায়। যা হোক, এতেও তিনি বিপুল কৃতিত্ব দেখান এবং তিনিই এসওই-র একমাত্র নারী সদস্য, যিনি জর্জ ক্রস পদক পান।
অডেটের জন্ম ফ্রান্সে। সেখানেই তার সাথে সাক্ষাৎ ঘটে ইংরেজ যুবক রয় স্যানসমের সাথে। তারা বিয়ে করে ইংল্যান্ড চলে যান এবং অডেটে তিন কন্যার মা হন।
মেয়েদের একটি কনভেন্টে রেখে ১৯৪২ সালে তিনি মিত্রশক্তির স্পাই হয়ে ফ্রান্স যান। তার সাঙ্কেতিক নাম হয় লিসে। ফ্রান্সে তার সাথে দেখা হয় পিটার চার্চিলের। গ্রেফতার হওয়ার আগ পর্যন্ত পিটারের কুরিয়ার হিসেবে কাজ করেন অডেটে।
গেস্টাপোর হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর চলে প্রচণ্ড নির্যাতন। কিন্তু অডেটে একটা কথাই শুধু বলেন, তার সঙ্গী পটার হচ্ছে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের ভাতিজা এবং অডেটে তার স্ত্রী।
এ কথা বলার উদ্দেশ্য ছিল, জার্মানরা যেন তাদেরকে মূল্যবান পণবন্দী বলে বিবেচনা করে এবং বাঁচিয়ে রাখে।
কিন্তু জার্মানরা অডেটেকে মৃত্যুদণ্ড দেয় এবং দণ্ড কার্যকর করার জন্য ১৯৪৩ সালের জুন মাসে তাকে র‌্যাভেন্সব্রুক কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেয়। কিন্তু ওরা মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার কোনো দিন ঠিক করে না দেয়ায় দণ্ড বিলম্বিত হয়। এভাবে প্রায় দুই বছর কেটে যায়। ১৯৪৫ সালে মিত্রজোটের সৈন্যরা র‌্যাভেন্সব্রুকের কাছাকাছি এসে পড়লে অডেটেকে সাথে নিয়ে মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করতে যায় ক্যাম্প কম্যান্ডটি ফ্রিৎস সুহরেন। তার আশা ছিল, অডেটের সাথে ‘যোগাযোগের’ সুবাদে সে তার যুদ্ধাপরাধী লেবেল আড়াল করতে পারবে। কিন্তু অডেটে তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন। ১৯৫০ সালে তার ফাঁসি হয়।
অডেটের প্রথম বিয়ে ভেঙে যায় ১৯৪৬ সালে। পরের বছর তিনি বিয়ে করেন পিটার চার্চিলকে। সেই বিয়েও ১৯৫৬ সালে ভেঙে গেলে তিনি বিয়ে করেন জিওফ্রে হ্যালোয়েসকে। ১৯৯৫ সালে ৮২ বছর বয়সে ব্রিটেনে তার মৃত্যু হয়।

 

ক্রিস্টিনা স্কারবেক

কথিত আছে, জনপ্রিয় জেমস বন্ড সিরিজের অমর স্রষ্টা ইয়ান ফ্লেমিং তার প্রথম বইয়ের একটি চরিত্র ভেসপার লিন্ড সৃষ্টির অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন ক্রিস্টিনার জীবন থেকে।
কে এই ক্রিস্টিনা? ক্রিস্টিনা হচ্ছেন পোল্যান্ডের এক অভিজাত ব্যক্তির আদুরে কন্যা। এই মেয়েটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর সাথে সাথেই ব্রিটিশ গোয়েন্দা বিভাগে ঢুকে পড়ে, যখন এমনকি এসওই আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিতই হয়নি।
বিলাসব্যসনে অভ্যস্ত এ মেয়েটি দায়িত্ব পেয়েই হাঙ্গেরি থেকে চোরাইপথে পোল্যান্ডে ঢুকে পড়ে। কিন্তু কাজটি এত সহজ ছিল না। মাইনাস ৩০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় তাত্রা পর্বতমালা অতিক্রম কঠিনতম কাজগুলোর একটি। সে কাজটি করে ক্রিস্টিনা পা রাখেন পোল্যান্ডে। যোগাযোগ করেন অন্যান্য এজেন্ট ও প্রতিরোধ যোদ্ধাদের সাথে। এরপর শুরু করেন পোলিশ বিমানসেনাদেরকে নিরপেক্ষ যুগোস্লাভিয়ায় পাচারের কাজ, যাতে তারা মিত্রশক্তির বিমানবাহিনীতে যোগ দিতে পারে।
১৯৪১ সালে শত্রুর হাতে ধরা পড়ে যান ক্রিস্টিনা। ধরা পড়ার পর তিনি আটককারীকে জানান যে, তিনি যক্ষ্মায় আক্রান্ত। প্রমাণ হিসেবে নিজের জিহ্বা কামড়ে রক্ত বের করে কাশি দিয়ে কফ ও রক্ত দেখান আটককারীকে। যুদ্ধের আগে একটি গাড়ির কারখানায় কাজ করার সময় তার ফুসফুসে কিছু কাটা দাগ পড়ে। তার এক্স-রে রিপোর্টও দেখান তিনি।
এই কৌশল ভালো কাজ দেয়। ছাড়া পেয়ে যান ক্রিস্টিনা। ছাড়া পেয়েই সোজা ইংল্যান্ড চলে যান। নিজের নাম বদলে ক্রিস্টিনা গ্র্যানভিল করে নেন। ১৯৪৪ সালে তাকে পাঠানো হয় ফ্রান্সের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে। দায়িত্ব পড়ে ফরাসি ও ইতালীয় প্রতিরোধ যোদ্ধাদের মধ্যে লিয়াজোঁ করার।
এখানে তিনি অনেক কৃতিত্ব দেখান। এর একটি হচ্ছে ৬০০ মিটার উঁচু পথ পাড়ি দিয়ে একটি দুর্গে পৌঁছা এবং সেখানকার ২০০ সেনাকে আত্মসমর্পণে রাজি করানো। আরেকবার তিনি ফিল্ড মার্শাল মন্টোগোমারির ভাতিজি সেজে এক জার্মান গেস্টাপো অফিসারকে রাজি করিয়ে তিন সহকর্মীকে মুক্ত করে আনেন। ছাড়িয়ে আনতে না পারলে ওদের মৃত্যুদণ্ড হতো।
যুদ্ধের পর তাকে জর্জ মেডেল ও ওবিই দেয়া হয়। কিন্তু ব্রিটিশ নাগরিকত্ব পেতে দেরি হওয়ায় তিনি হয়ে পড়েন দেশহীন। তার হাতে তখন অর্থও তেমন ছিল না। এ সময় তিনি এক ধরনের পরিযায়ী জীবনযাপনে বাধ্য হন। একপর্যায়ে একটি সমুদ্রগামী জাহাজে স্টুয়ার্ডসের চাকরি পান। ১৯৫২ সালে লন্ডনের একটি হোটেলের কক্ষে তাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে একজন পোর্টার (কুলি)। কারণ, তিনি তাকে পদোন্নতি দিতে অস্বীকার করেছিলেন।

 

এইলিন ‘দিদি’ নেয়ারনে

এইলিনের বাবা ব্রিটিশ, মা স্প্যানিশ। তার জন্ম ব্রিটেনে, বড় হয়েছেন ফ্রান্সে। জার্মানরা ফ্রান্স দখল করলে এইলিন জিব্রাল্টার পর্বত পাড়ি দিয়ে ব্রিটেনে চলে যান। লন্ডন পৌঁছেই এইলিন ও তার এক বোন একটি ফার্স্ট এইড নার্সিং প্রতিষ্ঠানে কাজে যোগ দেন। নার্সিং প্রতিষ্ঠানটিও আসলে ছিল গোয়েন্দা সংস্থা এসওই’র একটি ছদ্মবেশী শাখা।
২৩ বছর বয়সে ১৯৪৪ সালে এইলিনকে পাঠানো হয় ফ্রান্সে। তার কোড নাম হয় রোজ, আর ছদ্মনাম জ্যাকুলিন দু তেরত্রে। প্যারিসে বসে গোপন রেডিও ট্রান্সমিশনের সাহায্যে লন্ডনে বার্তা পাঠানোর কাজে লেগে পড়ে এইলিন।
কিন্তু অল্প দিনের মধ্যেই গোপন রেডিওর অবস্থান বের করে ফেলে গেস্টাপো। গ্রেফতার হন এইলিন। পিটিয়ে তাকে আধমরা করে ফেলা হয়। কিন্তু এইলিন বারবার একই কথা বলতে থাকেন যে, তিনি একজন ব্যবসায়ীর কাছে কিছু ব্যবসায়িক খবরাখবর পাঠান। এর বিনিময়ে তিনি কিছু টাকা পান।
ওই বছর আগস্ট মাসে তাকে র‌্যাভেন্সব্রুক কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে পাঠানো হয়। পরে তাকে লিপজিগের আরেকটি ক্যাম্পে নেয়ার সময় রক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে পালাতে সক্ষম হন। এরপর তার কয়েক সপ্তাহ কাটে বনের ভেতর লুকিয়ে। তারপর লিপজিগে এক পাদ্রিকে অনুনয়-বিনয় করে তার গির্জায় থাকার জায়গা করে নেন। সেখানেই আমেরিকান সৈন্যদের চোখে পড়েন তিনি। তারা তাকে মুক্ত করে এবং ব্রিটেনে পাঠিয়ে দেয়।
২০১০ সালে ৮৯ বছর বয়সে নিজ বাড়িতে তার মৃত্যু হয়।

 

ইথেল রোজেনবার্গ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়, কিন্তু গুপ্তচরবৃত্তি শেষ হয় না। আর সব গুপ্তচর যে পাশ্চাত্যের পক্ষের, তাও তো নয়।
যেমন নিউ ইয়র্কের ইথেল গ্রিনগ্লাস ও তার স্বামী জুলিয়াস রোজেনবার্গের কথাই ধরা যাক। আমেরিকার বিরুদ্ধে সোভিয়েত (অধুনালুপ্ত) হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির দায়ে ১৯৫৩ সালে বিদ্যুতায়িত চেয়ারে বসিয়ে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। রোজেনবার্গ আমেকিরার আণবিক বোমা নির্মাণসংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে পাচার করত।
ইথেলের দায়িত্ব ছিল তার ভাই ডেভিড গ্রিনগ্লাস যেসব গোপন তথ্য দিত, সেগুলো টাইপ করা। ভাই ডেভিড ও ভ্রাতৃবধূ রুথের সাক্ষ্যের ভিত্তিতেই মূলত দোষী সাব্যস্ত হয় ইথেল।
রোজেনবার্গ দম্পতিকে সিং সিং কারাগারে পাঠানো হয়। সেখানে ইথেলই ছিলেন একমাত্র নারী কয়েদি। তাদেরকে বারবার বলা হয়, যদি তারা দোষ স্বীকার করে এবং এই চক্রে কারা কারা আছে নাম বলে দেয়, তাহলে তাদের সাজা কমিয়ে দেয়া হবে। কিন্তু তারা বলতেই থাকে যে, তারা এসবের কিছুই জানে না। তারা নির্দোষ।
মেলিটা নরউড

মেলিটা নরউড ছিলেন একজন ব্রিটিশ সরকারি কর্মকর্তা এবং সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থার কেজিবির তথ্যের উৎস।
কেজিবি ১৯৩৭ সালে মেলিটাকে রিক্রুট করে। তারপর দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে তিনি ব্রিটিশ নন-ফেরাস মেটাল রিসার্চ অ্যাসোসিয়েশনে নিজ অবস্থানে থেকে কেজিবিকে রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য পাচার করে গেছেন।
মেলিটার পিতা ছিলেন লাতভিয়ান, মা ব্রিটিশ। কেজিবিতে তার সাঙ্কেতিক নাম ছিল ‘হোলা’। যার মাধ্যমে কেজিবির সাথে তার যোগাযোগ, তার মতে সোভিয়েত ইউনিয়নের রিক্রুট করা নারী এজেন্টদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন মেলিটা।
১৯৭২ সালে এসে মেলিটার স্পাইং বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু তার দেশদ্রোহিতার কথা ফাঁস হয় আরো ২০ বছর পর ১৯৯২ সালে রুশ পক্ষত্যাগী ভাসিলি মিত্রখিনই এ তথ্য জানান।
তবে মেলিটাকে এ জন্য কখনোই বিচারের মুখোমুখি হতে হয়নি। ২০০৫ সালে ৯৩ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়।

 

আনা চ্যাপমান

দুর্দান্ত মেধাবী (আইকিউ ১৬২), অনিন্দ্যসুন্দরী আনা চ্যাপমানের জন্ম স্তালিনগ্রাদে। মস্কো থেকে অর্থনীতিতে মাস্টার্স ডিগ্রিধারী আনা ২০০৩ সালে লন্ডন যান। সেখানে তার সাথে পরিচয়, প্রণয় ও পরিণয় হয় অ্যালেক্স চ্যাপমানের। তিনি ব্রিটিশ। সেই সূত্রে আনাও ব্রিটিশ নাগরিকত্ব পেয়ে যান।
রুশ-ব্রিটিশ দ্বৈত নাগরিক হওয়ার সুবাদে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যানহাটনে গিয়ে ঘাঁটি গাড়েন আনা। নিজের পরিচয় দেন একটি অনলাইন আন্তর্জাতিক আবাসন সংস্থার প্রধান রূপে।
নিজের মেধা ও রূপের চমকে সমাজ ও রাজনীতি বলয়ের কেষ্টবিষ্টুদের সাথে খাতির জমাতে একটুও বেগ পেতে হতো না আনার। এভাবেই চলছিল। কিন্তু ২০১০ সালে ‘বেরসিক’ এফবিআই তাকে গ্রেফতার করে বসে। অভিযোগ, আনা একটি গুপ্তচরচক্রের প্রধান।
এফবিআই’র অভিযোগ অনুসারে আনার অন্তত যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হওয়ার কথা। কিন্তু তার পরিবর্তে বন্দিবিনিময়ের আওতায় আনা ফেরত গেল রাশিয়ায়। স্নায়ুযুদ্ধ অবসানের পর এ ধরনের ঘটনা এটাই প্রথম।
দেশে ফিরে আনা পায় বীরোচিত সংবর্ধনা। রাশিয়ার সর্বোচ্চ পদক ঝুলল তার গলায়। সব ম্যাগাজিনের কভারে তার রঙিন ছবি। সব মিলিয়ে হুলস্থুল কাণ্ড।
আনার বয়স এখন ৩২। গত বছর তাকে দেখা গেছে প্রেসিডেন্ট পুতিনের ক্রিমিয়া আগ্রাসনের পক্ষে প্রচার চালাতে।