কেমন ছিলো উসমানী খিলাফতের স্বর্ণযুগ

Oct 19, 2017 02:26 pm
আনাতোলিয়ার ছোট্ট একটি জায়গিরের নাম ছিল সুগুত


মাসুদ মজুমদার

১.

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে উপমহাদেশের মানুষ ভারতজুড়ে খেলাফত আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ে। এ প্রজন্ম আলী ভ্রাতৃদ্বয়ের (মাওলানা মোহাম্মদ আলী-শওকত আলীর) নেতৃত্ব সম্পর্কে খবর রাখে, কিন্তু কেন এই খেলাফত আন্দোলন দানা বেঁধে উঠেছিল তা জানে না। বাংলাদেশের অনেক মানুষ এই আন্দোলনে শরিক হয়েছিলেন।

মোহন দাস করমচাঁদ গান্ধী এই আন্দোলনকে সমর্থন দিয়েছিলেন। ভারতে ইংরেজবিরোধী অসহযোগ আন্দোলনের মতোই খেলাফত আন্দোলনও ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছিল। এই আন্দোলনের জের ধরে ব্রিটিশরা দেশ বিভাগ করে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে এই উপমহাদেশ থেকে বিদায় নিতে বাধ্য হয়েছিল। যার ফলে পৌনে দুই শ’ বছরের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান হয়।


লক্ষ করেছি বাংলাদেশে উসমানী খলিফা সুলতান সুলাইমানের ওপর একটি দীর্ঘ তুর্কি ড্রামা সিরিয়াল বাংলায় ডাবিং হয়ে কয়েক বছর ধরে চলতে থাকে। সুলাইমান ছিলেন উসমানী খেলাফতের স্বর্ণযুগের শাসক। সিরিয়ালটি ইতিহাস আশ্রিত কিন্তু ইতিহাস নয়। ‘হেরেমে সুলতান’ নামে এটি পরিচিত। ইতিহাস আশ্রিত হওয়ার কারণে এর প্রতি জনগণের আকর্ষণ বেড়ে যায়, সবাই জানতে আগ্রহী হয়ে ওঠে উসমানী খেলাফত সম্পর্কে। ১২৯৯ সালে উসামানী খেলাফতের যাত্রা শুরু হয়। এর পরিসমাপ্তি হয় ১৯২৪ সালে মোস্তফা কামাল পাশার এক আইনের মাধ্যমে।
তখন শাসকেরা সুলতান, আমির ও খলিফা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তারা দেশ পরিচালনায় চার খলিফা, উমাইয়া ও আব্বাসী খেলাফতব্যবস্থাকে রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। অনেক বিচ্যুতি নিয়েও হজরত মোহাম্মদ সা:-এর মৃত্যুর পর ৬৩২ সাল থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত মদিনা, কুফা, দামেস্ক, বাগদাদ ও কনস্টান্টিনোপল বা ইস্তাম্বুলকে কেন্দ্র করে তিন মহাদেশজুড়ে খেলাফতব্যবস্থা টিকে ছিল। এর মধ্যে সোয়া ছয় শ’ বছরের শাসনকাল পরিচিত ছিল অটোমান বা উসমানী খেলাফত হিসেবে।

 

আমির বা খলিফা উসমানের উত্থান

আধুনিক তুরস্কের আনাতোলিয়ার ছোট্ট একটি জায়গিরের নাম ছিল সুগুত। এর জায়গিরদার ছিলেন আততুগরিল। কোনো কোনো ইতিহাস লেখক তাকে তুগরিল খান হিসেবে পরিচিতি দিয়েছেন। ১২৫৮ সালে তিনি এক পুত্রসন্তান লাভ করেন। তার নাম রাখেন উসমান। ১২৮৮ সালে পিতার মৃত্যুর পর ৩০ বছর বয়সে উসমান পিতার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে নিজেকে ‘খলিফা’ হিসেবে ঘোষণা করেন। এলাকার একজন খ্যাতনামা আলেমের কন্যাকে বিয়ে করে উসমান নিজের মধ্যে শাসক ও ধর্মীয় গুণের সমন্বয় ঘটাবার সুযোগ পান। সেই আলেমের নাম ছিল শায়খ আবিদ আলী। তার কন্যার নাম ছিল মা’ল খাতুন।


মাত্র ১০ বছরের মধ্যে উসমান তার শাসন এলাকার সীমানা ইয়েনি রাজ্য পর্যন্ত বিস্তৃত করেন। ইয়েনিতে রাজধানী স্থাপন করে ১২৯৯ সালে উসমান নিজেকে ‘আমির’ হিসেবে ঘোষণা করেন। মৌলিক মানবীয় গুণাবলি ও ইসলামি নৈতিকতার সমন্বয় ঘটেছিল উসমানের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে। তিনি ছিলেন কোমল ও কঠিনের মূর্ত প্রতীক। ইনসাফকে তিনি তার শাসনের মানদণ্ড বানিয়েছিলেন। জ্ঞানচর্চা ও শাসনদক্ষতার কারণে ওসমান হয়ে উঠেছিলেন সেই যুগের এক বিচক্ষণ শাসক। ন্যায়পরায়ণ শাসক হওয়ার কারণে তিনি ছিলেন অনাড়ম্বর এবং লোভহীন। একই সাথে ইসলামি অনুশাসন পালনের ব্যাপারে নিষ্ঠাবান। খ্যাতনামা আলেম, যিনি কিনা উসমানের শ্বশুর, তাকেই প্রধান কাজী বা বিচারকের আসনে বসিয়েছিলেন। পরে শায়খ মাওলানা আবিদ আলীকে মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করতে হয়েছিল।


আমির উসমান ছিলেন একজন সাহসী সৈনিক। তিনি এমন এক সৈন্য দল গঠন করেছিলেন যারা ইনসাফকে প্রাধান্য দিতে বাধ্য ছিল। আমলদার হতে হতো। মালসম্পদের প্রতি নির্মোহ থাকতে হতো। মসজিদ নির্মাণ, সালাত কায়েম করা ছিল ওসমানের অন্যতম গুণ। তিনি জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে পরমত ও ধর্ম সহিষ্ণুতার এক অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। নিজের সন্তানকে উসমানকে নছিহত করেছিলেন, কখনো কারো ওপর জুলুম করবে না, নিষ্ঠুরতা পরিহার করবে, জ্ঞানীদের সম্মান করবে, বিজিত এলাকায় ইসলামের উন্নত মানবিক ও নৈতিক নীতির প্রসার ঘটাবে, সব সময় আল্লাহর করুণা ও আশ্রয় প্রার্থনা করবে, ঐশী আইনকে সব কিছুর ঊর্ধ্বে স্থান দেবে, প্রজাদের রক্ষণাবেক্ষণ তথা প্রজাপালনকে প্রধান কর্তব্য বিবেচনা করবে, শরিয়ার বিধিবিধান মেনে চলবে।


উসমান ১২৯৯ সালে ইয়েনি বিজয় করে সেখানে উসমানী খেলাফতের প্রথম রাজধানী স্থাপন করেন। ১৩০১ সালে উসমান গ্রিসের একাংশ দখল করে নিতে বাধ্য হন। ১৩০২ সালে গ্রিসের রাজা উসমানকে পুনঃ আক্রমণ করলে উসমান গ্রিসের রাজাকে পরাজিত করেন। গ্রিস ছিল পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের অংশ। খ্রিষ্টানশাসিত গ্রিসের এশীয় অঞ্চল উসমান পুরোটাই দখলে নেন। সে সময় গ্রিস রাজ্যের অনেক সৈনিক ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়। এদের মধ্যে গ্রিক সেনাপতি এভারনোজ ছিলেন অন্যতম। তার অনুগতরা দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করার পর ১৩১৭ সালে আমির উসমানের সুযোগ্য সন্তান উরখান গ্রিসের ব্রুসা নগরী দখল করেন। এর পর থেকে ব্রুসা উসমানী শাসনের দ্বিতীয় রাজধানীর মর্যাদা পায়।


আমির উসমান টানা ৩৮ বছর শাসন পরিচালনা করে ১৩২৬ সালে ৭০ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। উসমান যখন মারা যান তখন তার সুযোগ্য সন্তান উরখান ১৩২৬ সালে ব্রুসার শাসক হিসেবে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। উরখান তার বিজিত নগরী ব্রুসার মসনদে বসে নিজেকে সুলতান হিসেবে ঘোষণা করেন। এর আগে উসমান তাকেই ক্ষমতার উত্তরাধিকার নিযুক্ত করেছিলেন। এবং এটা ছিল নিয়মতান্ত্রিক ক্ষমতা হস্তান্তর। আমির উসমান এমন এক শাসনকালের প্রতিষ্ঠাতা যার নামে সোয়া ছয় শ’ বছর তিন মহাদেশজুড়ে অটোমান সুলতানী সাম্রাজ্য পরিচালিত হয়েছে।

 

সুলতান উরখান

আমির উসমানের পর তার যোগ্য ছেলে উরখান শাসনভার গ্রহণ করেন ১৩২৬ সালে। ৩৩ বছর শাসনকাজ পরিচালনা করে তিনি ৭৫ বছর বয়সে ১৩৫৯ সালে মৃত্যুবরণ করেন। উরখান ছিলেন উসমানের সুযোগ্য সন্তান। বাবার মতোই তিনি সাদাসিধে জীবনযাপন করতে অভ্যস্ত ছিলেন। তিনি সেনাবাহিনীকে নিয়মিত বাহিনীতে রূপ দেন। তার প্রচেষ্টায় ব্রুসা একটি আদর্শ মুসলিম নগরীর মর্যাদায় উন্নীত হয়। মসজিদ, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ উন্নয়ন সমৃদ্ধ নগরীর ধারণায় ব্রুসা ছিল উপমা। বেতনভোগী ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাহিনীর ধারণা উরখানের। পদাতিক ও অশ্বারোহীরা ছিল চৌকস। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সব নাগরিক ছিল সন্তুষ্ট। বীর যোদ্ধা উরখান ১৩২৭ সালে গ্রিসের রাজা তৃতীয় এন্ড্রেনিকাসকে যুদ্ধে পরাজয় মেনে রাতের অন্ধকারে পালাতে বাধ্য করেছিলেন। উরখান নাইসিয়া দখল করেন। নাইসিয়াবাসী মুসলিম সৈনিকদের আচরণে মুগ্ধ হয়ে স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেন। রণাঙ্গনে উরখানের নেতৃত্বেই উসমানী সেনারা প্রথম নিকোমেডিয়া জয় করে ইউরোপের মাটিতে পদচিহ্নহ্ন এঁকে দেন। ১৩৫৬ সালে উরখান গ্যালিপালি জয় করেন। স্থানীয় রাজা প্রীত হয়ে রাজকুমারী থিয়োডোরাকে উরখানের কাছে বিয়ে দেন।

১৩৫৯ সালে উরখান যখন মারা যান তখন তার বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। তার শাসনকালের ব্যাপ্তি ছিল ৩৩ বছর। উরখানের আমলে উসমানী শাসনের প্রাতিষ্ঠানিকতা বৃদ্ধি পায়। ইসলামের শান্তির বাণী ইউরোপকে আপ্লুত করে। বিভিন্ন রণাঙ্গনে ও বিজিত এলাকার সৈনিক ও জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইসলামের ছায়াতলে আসার সুযোগ পায়। উরখান নওমুসলিম, যারা সদ্য খ্রিষ্টান থেকে মুসলিম হয়েছিলেন, তাদেরকে নিয়ে একটি জাননিসাব নামে নতুন সৈন্য দল গঠন করেছিলেন যারা ছিল অপেক্ষাকৃত যুবক, প্রাণচঞ্চল এবং ইসলামের ছায়াতলে আসা নতুনভাবে উদ্দীপ্ত মুজাহিদ। এই বাহিনী ছিল অন্যান্য নিয়মিত বাহিনী থেকে আলাদা।


অটোমান সাম্রাজ্য তথা উসমানী খেলাফতের ভিত্তিটা মহান উসমানের নামেই শেষ পর্যন্ত টিকে ছিল। তার অবদান অস্বীকার করে কোনো শাসক তার নামে চালু হওয়া খেলাফতব্যবস্থার নাম পরিবর্তন করার ধৃষ্টতা দেখাননি। তাই ইতিহাসে উমাইয়া-আব্বাসী যুগের পর উসমানী খেলাফত ইতিহাসে স্থায়ী রূপ পায়। বাংলাদেশের মানুষ তুর্কি খেলাফত হিসেবেও এই সোয়া ছয় শ’ বছরের শাসনকালকে অভিহিত করে থাকে।

 

সুলতান প্রথম মুরাদ

১৩৫৯ সালে উরখানের সন্তান মুরাদ ব্রুসার শাসনভার গ্রহণ করেন। মুরাদ ছিলেন স্বশিক্ষিত কিন্তু প্রতিভার গুণে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বিচক্ষণ শাসক ও দূরদর্শী রাজনীতিবিদ। ইসলামি অনুশাসন পালনে মুরাদ ছিলেন নিষ্ঠাবান। একই সাথে ইসলামের উদারনৈতিক ভাবনা ও সহনশীল নীতিকে মুরাদ তার শাসননীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তার আমলে খ্রিষ্টান সম্প্রদায় এতটা স্বচ্ছন্দ বোধ করত যে প্রজাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা কাকে বলে তার উপমা হয়ে উঠেছিলেন মুরাদ। তিনিও ছিলেন দাদার মতো বিচক্ষণ ও চৌকস সংগঠক। সেনাবাহিনীর প্রতি তার নজর ছিল এমন যে, পূর্বপুরুষদের সেনাদলকে তিনি আরো সুশৃঙ্খল ও পারঙ্গম করে তুলেছিলেন। মুরাদ চাইতেন এবং জানতেন পূর্বপুরুষদের অর্জনকে টিকিয়ে রাখা ও টেকসই করার জন্য দক্ষ সেনাবাহিনীর কোনো বিকল্প নেই। তাই রণাঙ্গনে সুলতান প্রথম মুরাদের সাফল্য ছিল তাৎপর্যপূর্ণ।

১৩৬৩ সালে তিনি গ্রিস বাহিনীকে পরাজিত করে আড্রিয়ানোপন দখল করেন। একই বছর তিনি মাবিৎজা নদীর তীরে সংঘটিত যুদ্ধে সমন্বিত খ্রিষ্টান বাহিনীকে পরাজিত করে মেসিডোনিয়া দখল করেন। অল্প সময়ের ব্যবধানে মুরাদ বর্তমান সময়ের রুমানিয়া হিসেবে পরিচিত থ্রেস দখল করেন। এর আগেই প্রথম মুরাদ আড্রিয়ানোপলে রাজধানী স্থানান্তর করেছিলেন। ১৩৭২ সালে সার্বিয়ার সাহায্য নিয়ে বুলগেরিয়া ওসমানী খেলাফতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামে। সামাকফ প্রান্তরে মরণপণ যুদ্ধে মুরাদ পরিচালিত বাহিনী জয়লাভ করে। এর ফলে বুলগেরিয়াও ওসমানী খেলাফতের শাসনাধীনে চলে আসে। ১৩৮৯ সালে সার্বিয়া ও বুলগেরিয়া মাঝখানে অবস্থিত কসোভো যুদ্ধে ইউরোপীয় খ্রিষ্টান শক্তি সার্বিয়ার রাজা ল্যাজারাসের নেতৃত্বে যুদ্ধ শুরু হলে মুরাদ বাহিনীর হাতে তারা পরাজিত হয়। ল্যাজারাস বন্দী হলে তাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। কসোভো রণাঙ্গনে বিজয়ের পর কভিলভিম নামে এক স্লাভ সৈনিক অতর্কিতে প্রথম মুরাদকে টার্গেট করে হত্যা করতে সক্ষম হয়। ১৩৮৯ সালে প্রথম মুরাদ যুদ্ধ শেষে রণাঙ্গনেই শাহাদত বরণ করেন। তার শাসনকালের ব্যাপ্তি ছিল ৩০ বছর।
আমির ওসমানের ৩৮ বছরের শাসনকালে উসমানিয়া খেলাফতের ভিত্তি তৈরি হয়। সুলতান উরখানের ৩৩ বছরের শাসনকালে সেই ভিত্তি মজবুতি পায়। একই সাথে প্রাতিষ্ঠানিকতা অর্জন করতে সক্ষম হয়। প্রথম মুরাদের ৩০ বছরের শাসনকাল ছিল বিস্তৃতি, সক্ষমতা প্রদর্শন ও সামর্থ্য অর্জনের কাল। এই পথ ধরেই উসমানী খেলাফতব্যবস্থা সকল দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা নিয়েও সোয়া ছয় শ’ বছর টিকে ছিল।