যে ছোট দেশে সব বড় দেশের সামরিক ঘাটি আছে

Oct 12, 2017 11:41 am
আফ্রিকা মহাদেশের তৃতীয় ক্ষুদ্রতম দেশ


আসিফ হাসান


আফ্রিকার ছোট্ট একটি দেশ। নাম জিবুতি। আফ্রিকা মহাদেশের তৃতীয় ক্ষুদ্রতম দেশ। বেশির ভাগ এলাকাই বিরান, জনসংখ্যা ১০ লাখেরও কম। কিন্তু এই দেশেই একের পর এক সামরিকঘাঁটি গাড়ছে পরাশক্তিগুলো। যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, চীনের মতো দেশের সামরিক উপস্থিতি রয়েছে এখানে। এবার তাতে শামিল হতে যাচ্ছে ভারত। দেশটিতে ভারতের কোনো দূতাবাস না থাকলেও নতুন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ এই দেশটিই সফর করলেন।


কেন এমন গুরুত্ব এই দেশটির? তার ভৌগোলিক অবস্থান হচ্ছে এটা আফ্রিকা, পশ্চিম এশিয়া এবং অবশিষ্ট এশিয়াকে সংযুক্ত করেছে। সোমালিয়া, ইরিত্রিয়া ও ইয়েমেনের মধ্যখানে দেশটির অবস্থান। এটাই হলো দক্ষিণ দিক দিয়ে লোহিত সাগরে প্রবেশের পথ। দেশটির লাগোয়া বাব আল মানদেব প্রণালীটি আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য কৌশলগতভাবে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। আর অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক, সামরিক ইত্যাদি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় এর গুরুত্ব অপরিসীম। এ কারণেই ইউরোপ, এশিয়া ও আমেরিকার বিভিন্ন বাহিনীর কাছে কোনো না কোনো কারণে জিবুতিকে কদর করতে হয়। আরেকটি কারণেও এর গুরুত্ব রয়েছে। আশপাশের দেশগুলোতে নানা উত্থান-পতনের মধ্যেও জিবুতি অনেকটাই স্থিতিশীল দেশ।


ফ্রান্স সেই উপনিবেশ আমল থেকে এখানে ঘাঁটি গেড়ে আছে। তারপর ৯/১১-এর পর যুক্তরাষ্ট্র আফ্রিকার একমাত্র স্থায়ী ঘাঁটিটি প্রতিষ্ঠা করে এখানেই। জাপানের একমাত্র বৈদেশিক সামরিকঘাঁটিও জিবুতিতে। এরপর চীন একই পথ অনুসরণ করেছে। এখানেই শেষ নয়, জার্মানি ও স্পেনের সৈন্যরাও সেখানে রয়েছে। তবে তারা রয়েছে ফরাসিদের অতিথি হিসেবে। অতি সম্প্রতি সৌদি আরব, আরব আমিরাতের মতো দেশও এ দেশটির দিকে নজর রাখছে। ইরানও খুব বেশি পিছিয়ে নেই। ইয়েমেন নিয়ে সৌদি আরব ও ইরানের দ্বন্দ্বের ছায়া এখানেও পড়ে।
সুযোগটা কিন্তু জিবুতি বেশ ভালোভাবে নিয়েছে। তারা কারো পক্ষে নয়, বরং সবাইকে টেনে বিনিয়োগের মাধ্যমে গরিবি দূর করার চেষ্টা করছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ঘাঁটিটির জন্য যুক্তরাষ্ট্র ভাড়া হিসেবে বছরে দেয় ৬৩ মিলিয়ন ডলার। চীন দিচ্ছে ২০ মিলিয়ন ডলার। এ ছাড়া রেলওয়ে, বন্দর, শিল্পপার্ক আর বন্দর নির্মাণে বিলিয়ন বিলিয়ন বিনিয়োগ করছে চীন।

এমন প্রেক্ষাপটে ভারতের রাষ্ট্রপতি কোবিন্দ প্রথমবারের মতো সফর করেছেন জিবুতি। এই অঞ্চলে ভারত তার কৌশলগত অবস্থান বৃদ্ধির প্রয়াস চালানোর প্রেক্ষাপটে এই সফরটি ‘হর্ন অব আফ্রিকা’র ভূ-রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। জলদস্যুবিরোধী অভিযানের মাধ্যমে এই অঞ্চলে আগে থেকেই ভারতীয় নৌবাহিনী তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে। ভারতীয় নৌবাহিনী ইয়েমেন থেকে তাদের নাগরিকদের সরিয়ে নেয়ার কাজেও জিবুতি থেকে ভারতীয় নৌবাহিনীকে ব্যবহার করছে।


জিবুতিতে বর্তমানে ভারতের কোনো দূতাবাস নেই। রাষ্ট্রপতির সফরে মনে হচ্ছে, নয়াদিল্লি এখন এই অঞ্চলের ব্যাপারে তার অবস্থান পুনঃমূল্যায়ন করছে এবং নতুন করে কৌশলগতভাবে নিয়োজিত হচ্ছে। শিগগিরই কেবল দূতাবাসই খুলবে না, আরো কিছু করবে, তা নিশ্চিতই বলা যায়।


সাধারণভাবে বলা হয়ে থাকে, ভারতীয় নৌবাহিনীর কার্যক্রম শুরু হয় মালাক্কা প্রণালীর বাব-আলমানদিব থেকে। ভারতীয় কৌশলবিদরা ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান চীনা প্রভাব প্রতিরোধের কথা বলে আসছেন। তাদের মতে, জিবুতিতে চীনাঘাঁটি বেইজিংয়ের প্রভাব বাড়ানোর ওই উদ্যোগের বাস্তব নিদর্শন। এখন ভারতের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মূল প্রতিবাদ্য বিষয়ের মধ্যে রয়েছে নৌপথ সুরক্ষা, গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোর নিয়ন্ত্রণ এবং ভারত মহাসাগরের প্রধান দ্বীপগুলোর প্রবেশপথগুলো রক্ষা করা। বলা হয়ে থাকে, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ‘মূল নিরাপত্তা যোগানদাতা’ হলো নয়াদিল্লি। সে ক্ষেত্রে কৌশলগত নৌ অবস্থান জিবুতি হতে পারে সেই লক্ষ্য পূরণের অন্যতম মাধ্যম।


ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান চীনা নৌবাহিনীর উপস্থিতি নয়াদিল্লি বেশ চাপে রয়েছে। পাকিস্তানে চীনা সাবমেরিনের উপস্থিতি তাদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। শ্রীলঙ্কায় বন্দর নির্মাণেও স্বস্তিতে নেই নয়াদিল্লি। এখন চীনা এই অবস্থান একমাত্র প্রতিরোধ করার জন্য ভারত তার নৌবাহিনীকে ব্যবহার করার কথা ভাবছে।


এই অঞ্চলে প্রতিদ্বন্দ্বী নৌবাহিনীর তৎপরতার নজরদারি করার জন্য ভারতীয় নৌবাহিনী আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জকে কৌশলগত ফাঁড়ি হিসেবে গড়ে তুলছে। গত কয়েক বছরে ভারত বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত ভূখণ্ডে তার সামরিক সামর্থ্য বাড়াচ্ছে। এসবের মধ্যে রয়েছে নৌ বিমান স্টেশন পুনঃগঠন, অভিযান পরিচালনার মতো কাঠামো নির্মাণ ইত্যাদি। চীনা নজরদারি কার্যক্রম প্রতিরোধের জন্য আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কাছে ভারত সমন্বিত নজরদারি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে। চীনা নৌবাহিনীর তৎপরতায় নজরদারি চালানোর জন্য শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও অন্যান্য এলাকায় রাডার কেন্দ্রও স্থান করছে ভারত।


জিবুতিতে ভারতীয়ঘাঁটি নির্মাণ করা হলে তা চীনা কৌশলগত চিন্তাবিদদের ওপর বিপুল প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তাদের উচ্চাকাক্সক্ষায় তা অনুভূত হবে। এই অঞ্চল এবং পশ্চিম এশিয়ায় অপ্রচলিত নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ বাড়তে থাকায় এলইএমওএ’র মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে বর্ধিত সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা সৃষ্টি হয়েছে। এই চুক্তি ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীকে তাদের সামর্থ্য বৃদ্ধি, আরো ব্যাপক মানবিক সহযোগিতা কার্যক্রম পরিচালনা ও ত্রাণকার্যক্রম চালানোর সুযোগ দেবে। তা ছাড়া আরো বিস্তৃত এলাকায় দেশটির গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষা করার সক্ষমতা সৃষ্টি করবে।


দক্ষিণ চীন সাগরে চীনা নৌবাহিনীর কার্যক্রমও বাব-আলমানদিবের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে প্রভাব বৃদ্ধির আরেকটি কৌশলগত উচ্চাভিলাষের পূর্বাভাস হতে পারে। নতুন নতুন ঘাঁটি স্থাপন এবং অর্থনৈতিক চুক্তির মাধ্যমে চীন বিশ্বজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে প্রভাব সৃষ্টির চেষ্টা করে যাচ্ছে। এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ দিয়েই বিশ্ববাণিজ্যের প্রায় ৯০ ভাগ সম্পন্ন হয়। এসব পয়েন্টের কোনো একটায় বিঘœতা সৃষ্টি হলে সারা বিশ্বের জিডিপি, চাকরি, মুদ্রাস্ফীতিতে মারাত্মক প্রভাব ফেলবে।


তাই সব পক্ষই এর নিয়ন্ত্রণ নিতে বদ্ধপরিকর। এতে করে ছোট্ট, নাম গোত্রহীন দেশটি হয়ে পড়েছে সবার আদরের পাত্র।

দেশ পরিচিতি : জিবুতি
বাব আল-মানদেব প্রণালী ঘেঁষে ছোট্ট আফ্রিকান দেশ জিবুতি বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত জাহাজ চলাচল রুট সুয়েজ খালের প্রবেশদ্বার।
দেশটির বন্দরই এর অর্থনীতির প্রাণশক্তি। দেশটি বলতে গেলে বিরাণভূমি। বন্দরই তাদের আয়ের প্রধান উৎস, চাকরির ব্যবস্থাও হয় এখান থেকে।
আফ্রিকা আর মধ্যপ্রাচ্যের গোলযোগপূর্ণ অঞ্চলের কাছেই জিবুতির অবস্থান। অথচ বেশ শান্ত দেশটি। এ কারণেই বিদেশী সামরিক ঘাঁটির জন্য মূল্যবান হিসেবে বিবেচিত হয় দেশটি।
সাবেক উপনিবেশ শক্তি ফ্রান্স সেখানে বেশ বড় ধরনের সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে। আফ্রিকার সবচেয়ে বড় সামরিক ঘাঁটিও সেখানে।

নাম : দি রিপাবলিক অব জিবুতি
রাজধানী : জিবুতি
জনসংখ্যা : ৯,২৩,০০০
আয়তন : ২৩,২০০ বর্গকিলোমিটার (৮,৯৫০ বর্গমাইল)
ভাষা : ফরাসি, আরবি, সোমালি, আফার
ধর্ম : ইসলাম
গড় আয়ু : ৫৭ বছর (পুরুষ), ৬০ বছর (নারী)
মুদ্র : জিবুতিয়ান ফ্রাঙ্ক।