কেন বাড়ছে ধর্ষন

Oct 05, 2017 05:21 pm
 ধর্ষণ ব্যাপারটা কেবল মাত্র মানুষের মধ্যেই ঘটতে দেখা যায়

 

এবনে গোলাম সামাদ

পাশবিক নির্যাতন কথাটা আমরা এখন যথেষ্ট ব্যবহার করে থাকি। কিন্তু এর কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। কেননা যৌনজীবনে পশুরা মোটেও তাদের স্ত্রীলিঙ্গের ওপর বলাৎকার করে না। ধর্ষণ ব্যাপারটা কেবল মাত্র মানুষের মধ্যেই ঘটতে দেখা যায়। প্রাণী জগতে অন্যান্য প্রাণীর তুলনায় মানুষ অনেক বেশি কামাসক্ত। আর তাদের মধ্যে থাকতে দেখা যায় নানা প্রকার যৌন বিকৃতি। অনেক মানুষ আছে যারা নারীর ওপর অত্যাচার করে তৃপ্তিলাভ করে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় যাদের বলে ধর্ষকামী (Sadist)। যারা করতে চায় যৌনমিলনের সময় নানাবিধ অত্যাচার। কিন্তু কিছু ব্যক্তি কেন ধর্ষকামী হয় সে প্রশ্নের উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। অন্যান্য প্রাণীদের তুলনায় মানুষের কাম তাড়না অনেক প্রবল। আর তাড়নার বশে অনেক মানুষ এমন অনেক কিছু করে বসতে পারে, যা সমাজ জীবনের জন্য মোটেও কাক্সিক্ষত নয়। তাই মানুষের সমাজ জীবনে যৌন অপরাধের জন্য হতে পেরেছে নানা আইন। অন্য প্রাণীদের ক্ষেত্রে কোনো আইনের প্রশ্ন দেখা দেয়নি।

অবশ্য জীবনের কোনো ক্ষেত্রেই অন্য প্রাণীদের আইনের প্রয়োজন হয়নি। যুক্তি দিয়ে তারা চলে না। তারা চলে সহজাত ধর্মের প্রেরণায়। কাক নিয়ে গবেষণা করে দেখা গিয়েছে, এক গাছে যত কাক থাকে, তাদের মধ্যে কোনো কাক অন্ধ হয়ে গেলে সেই গাছের অন্য কাকরা তাকে খাদ্য এনে খাওয়ায়। এটা তাদের সহজাত ধর্ম। তাদের মধ্যে কোনো রাষ্ট্র নেই। কিন্তু মানুষের মধ্যে প্রয়োজন হয়েছে রাষ্ট্র গড়ার। আর আমরা রাষ্ট্রিক আইনের মাধ্যমে চাচ্ছি দুস্থ মানুষকে সাহায্য করতে। রিরংসা অন্য প্রাণীর মধ্যেও আছে। রিরংসা স্বাভাবিক। কিন্তু বিবাহ ব্যবস্থাকে বলা চলে না স্বাভাবিক। সেটা অনেক পরিমাণেই হলো সাংস্কৃতিক। মানব জীবন, প্রকৃতি ও সংস্কৃতির যোগফল। মনোবিজ্ঞানে উদগতি (Sublimation) বলে একটি কথা আছে। মানুষ চেয়েছে তার যৌন তাড়নাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে। আর এই জন্য তার যৌন তাড়নাকে সে চেয়েছে অন্যবিধ তাড়নায় রূপান্তরিত করতে। যেমন সাহিত্য, শিল্পকলা ইত্যাদি ক্ষেত্রে নিয়োজিত করতে। যার মাধ্যমে আবার ঘটেছে কিছু-না-কিছু যৌনতার প্রকাশ। মানুষ সাহিত্য পড়ে, শিল্পকর্ম দেখে পরোক্ষভাবে পেতে পেরেছে তার যৌন তাড়নার পরিতৃপ্তি। সাহিত্য ও শিল্পকলা একদিক থেকে হলো মানুষের যৌনজীবনের অংশ; যা মানুষকে ধর্ষকামিতা থেকে বিরত রাখে। কেননা তা মানুষকে নিয়ে যায় কল্পলোকে।


পাখিদের রক্ত মানুষের মতোই গরম। তাদের হৃদপিণ্ডে থাকে প্রায় মানুষের মতোই চারটি প্রকোষ্ঠ। কিন্তু তা বলে তাদের যৌনজীবন মানুষের মতো নয়। পাখিরা বছরে বিশেষ মওসুমে যৌনতাড়না অনুভব করে। কিন্তু সারাবছর করে না। বিশেষ মওসুমে তারা বাসা বানায়, ডিম পাড়ে। স্তন্যপায়ী জন্তুদের মধ্যেও সাধারণত থাকতে দেখা যায় বছরের বিশেষ সময় সাবক ধারণ করতে। সারা বছর তারা যৌনতাড়না অনুভব করে না। তাদেরও আছে যৌনতাড়নার মওসুম। কিন্তু মানুষের মধ্যে এরকম কোনো বিশেষ মওসুম নেই। সারা বছরই তারা অনুভব করে যৌনতাড়না।


সাধারণ বানর নিয়ে গবেষণা করে দেখা গেছে, তাদের যৌনজীবন কতকটা মানুষেরই মতন। তাদের সাবক ধারণের কোনো বিশেষ মওসুম নেই। কিন্তু তারা তাদের স্ত্রী জাতির ওপর মানুষের মতো অত্যাচার করে না। সিম্পাঞ্জি ও গোরিলাদের নিয়ে গবেষণা করে দেখা গেছে যে, তারা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে বাস করে। এই দল গড়ে ওঠে প্রধানত একেকজন শক্তিশালী সিম্পাঞ্জি ও গোরিলাকে নির্ভর করে। এই শক্তিশালী পুরুষ সিম্পাঞ্জি ও গোরিলা তাদের নিজ নিজ দলের স্ত্রী সিম্পাঞ্জি ও গোরিলার ওপর কর্তৃত্ব করে।

অন্যান্য দুর্বল পুরুষ সিম্পাঞ্জি ও গোরিলারা সেটা করতে পারে না। আর একটি জিনিস প্রাণিজগতে লক্ষ করা যায়, তা হলো গৃহপালিত প্রাণীরা সারা বছর সাবক ধারণ করতে পারে। তাদের মধ্যেও থাকে না প্রজননের কোনো মওসুম। কিন্তু তাদের যৌনজীবন প্রধানত নিয়ন্ত্রিত হয় মানুষের দ্বারা। কেন গৃহপালিত প্রাণীদের কোনো বিশেষ প্রজনন মওসুম থাকে না, সেটার উত্তর এখনো দেয়া যায়নি। কিন্তু এখন এটা নিশ্চিতভাবেই প্রমাণিত হতে পেরেছে যে, অন্যান্য প্রাণীর তুলনায় মানুষ অনেক বেশি রিরংসাক্লিষ্ট। আর তাই মানুষের জীবনে ঘটতে পারে যৌন অপরাধ। ইসলামে যৌন অপরাধ কমানোর জন্য গড়ে উঠেছিল পর্দাপ্রথা। এর লক্ষ্য ছিল মেয়েদের ধর্ষণের হাত থেকে রক্ষা করা।

মেয়েরা কায়িক শক্তিতে পুরুষের তুলনায় দুর্বল। তাদের পৃথক করে রাখলে তারা ধর্ষণের হাত থেকে অনেক পরিমাণে মুক্ত থাকতে পারবে, এরকম ধারণা নিয়েই উদ্ভব হতে পেরেছিল পর্দা প্রথা। তবে মুসলমান সমাজে তা বলে মেয়েদের গৃহবন্দী করে রাখার চেষ্টাও আবার হয়নি। তারা যথাযথ আব্র“ করে বাইরে বেরুতে পেরেছেন, অংশ নিতে পেরেছেন ব্যবসায়-বাণিজ্যে। ইসলামে মেয়েদের পৃথক সম্পত্তি রাখার অধিকার প্রদান করা হয়েছে। দেয়া হয়েছে মাতা-পিতা ও স্বামীর সম্পত্তি লাভের অধিকার। আর দেয়া হয়েছে এই সব সম্পত্তি থেকে আয় করার যথাযথ অধিকার। মেয়েরা অনেক কাজ ঘরে বসেই করতে পারেন। যেমন সিবনকর্ম। আমরা জানি, সুইজারল্যান্ড খুবই উন্নত রাষ্ট্র। সেখানে ঘরে বসে মেয়েরা ঘড়ির বিভিন্ন অংশ তৈরি করে যথেষ্ট রোজগার করেন। তারা বাইরে যান না পুরুষের সাথে একত্রে কাজ করতে। সুইজারল্যান্ডে যৌন অপরাধ অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম ঘটতে দেখা যায়।


কিছু পত্রপত্রিকায় বোঝানোর চেষ্টা চলেছে যে, এ বছর বর্ষবরণ উৎসবে মুসলিম মৌলবাদীরা মেয়েদের ওপর হামলা করেছেন। কেননা তারা চান না, এ ধরনের বর্ষবরণ উৎসব। তারা আসলে হলেন বাঙালি সংস্কৃতির বিরোধী। কিন্তু আগে আমাদের দেশে এ রকম বর্ষবরণ উৎসব হতো না। পয়লা বৈশাখে হতো হালখাতা। দোকানিরা এ সময় নতুন বছরের জন্য করতেন নতুন হিসাবের খাতার উদ্বোধন। এ সময় তারা তাদের বাঁধা খরিদদারদের নিমন্ত্রণ করে মিষ্টিমুখ করাতেন। বাঁধা খরিদদাররা তাদের কাছে দোকানিদের কিছু পাওনা থাকলে সেটা শোধ করতেন। এ রকম নববর্ষের হইহুল্লোড় ছিল একেবারেই অজানা। আমরা এখন সবকিছুর সাথেই রাজনীতি মিশিয়ে ফেলছি। নববর্ষের উৎসব হলো তার একটি বিশেষ দৃষ্টান্ত। আসলে যাকে বলা হচ্ছে বাংলা নববর্ষ, সেটা উদ্ভব বাংলাদেশে হয়নি। এর প্রবর্তন করেন সম্রাট আকবর ৬৬২-৬৬৩ হিজরিতে। হিজরি চন্দ্র্রাব্দ। কিন্তু আকবর প্রবর্তিত এই অব্দ হলো সৌর অব্দ। আকবর এটা গ্রহণ করেন পারস্যের সাফাভিদ রাজাদের অনুকরণে। তিনি এটা করেন খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য। এই উপমহাদেশে মানুষ রাজাকে খাজনা দিত তাদের উৎপাদিত মূল ফসল বিক্রি করে।

আমরা জানি পৃথিবী এক দিকে হেলে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে বলে ঋতু পরিবর্তন হয়। বিভিন্ন ঋতুতে উৎপন্ন হয় বিভিন্ন ফসল। ফসল উৎপাদনের সাথে থাকে সৌর অব্দের বিশেষ সঙ্গতি। আকবর তাই গ্রহণ করেন পারস্যের অনুকরণে সৌর অব্দ। একে বলা হতে থাকে ফসলি। এই ফসলি অব্দকে এখন বলা হচ্ছে বঙ্গাব্দ। কিন্তু এই অব্দ এক সময় চলেছে সারা উত্তর ভারতে। পাঞ্জাবেও প্রচলিত ছিল এই একই অব্দ। এটা বাংলাদেশের কোনো নিজস্ব অব্দ নয়। তাই যারা বঙ্গাব্দ নিয়ে গর্ব করছেন, বোঝাতে চাচ্ছেন এটা হলো বাঙালির বিশেষ গৌরব, তারা আসলে জানেন না অথবা জেনেও স্বীকার করেন না এই অব্দের ইতিহাসকে। এরা ঘটাচ্ছেন বাঙালিত্বের নামে ইতিহাস বিকৃতি। আসলে ইতিহাস বিকৃতি হয়ে উঠেছে এদের রাজনীতির অন্যতম পুঁজি। এই উপমহাদেশের নানা জায়গায় নানা সন প্রচলিত ছিল।

এই সন গণনার পদ্ধতি নিয়ে প্রথম একটি বই লেখেন স্যার আলেকজান্ডার কানিংহাম। বইটির নাম হলো Book of Indian Eras । বইটি কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয় ১৮৮৩ খ্রিষ্টাব্দে। বইটি পড়লে এই উপমহাদেশের বিভিন্ন সাল গণনা পদ্ধতি সম্পর্কে অনেক কিছু অবগত হওয়া যায়। এ ছাড়া আছে এস বি দিক্ষিতের লেখা The Indian Calendar নামে একটি গ্রন্থ; যা লন্ডন থেকে প্রকাশিত হয় ১৮৯৮ সালে। এই বইটি পড়লেও এই উপমহাদেশে প্রচলিত বিভিন্ন সন সম্পর্কে অবগত হওয়া চলে। কিন্তু এখন মনগড়াভাবে বলা হচ্ছে বঙ্গাব্দের কথা; যার সাথে বঙ্গের আদি ইতিহাসের কোনো যোগসূত্র নেই। এমনকি আমরা যাদের বলি বাংলা মাস। সারা উত্তর ভারতেই সেই একই নামে প্রচলিত আছে বারো মাসের নাম। এই মাসের নামগুলো কেবলমাত্র বাংলাভাষার নয়। অনেকেই জানেন না যে, সাল গণনার ক্ষেত্রে একসময় বাংলাদেশে অগ্রহায়ণ মাসকে ধরা হতো বছরের প্রথম মাস। কারণ এ সময় উঠত ধানের মূল ফসল; যাকে বলা হতো হৈমন্তিক বা আমন ধান। কিন্তু এখন বৈশাখকে ধরা হচ্ছে বছরের শুরুর মাস। এটা কিভাবে আরম্ভ হতে পেরেছে তা আমাদের জানা নেই। কিন্তু আমাদের পূর্বপুরুষ বৈশাখকে বছরের আরম্ভ ধরেননি। তাই পয়লা বৈশাখকে নিয়ে এত হইচই করার কোনো ভিত্তি আছে বলে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি না।


মুসলমান সমাজে নারীর সম্ভ্রম রক্ষাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। গ্রামবাংলায় প্রচলিত ছিল নিজাম ডাকাতের কাহিনী। যেটা সঙ্কলিত হয়েছে (যতদূর মনে পড়ছে) ময়মনসিংহ গীতিকায়। নিজাম ছিল ভয়ঙ্কর প্রকৃতির ডাকাত। সে ডাকাতি করে মানুষের সর্বস্ব হরণ করত। ডাকাতি ছিল তার জীবিকার উপায়। কিন্তু পরে সে ফকির শেখ ফরিদের উপদেশে হয়ে ওঠে খুবই সাধুব্যক্তি। ডাকাতি ছেড়ে নিজামকে শেখ ফরিদ বলেন আল্লার বন্দেগি করতে। শেখ ফরিদ নিজাম ডাকাতকে তার হাতের লাঠি দিয়ে বলেন, এই লাঠিটা তোমার বাড়ির আঙিনায় পুঁতে রাখবে। যখন দেখবে এই লাঠির মাথায় সবজি পাতা গজিয়েছে তখন বুঝবে তুমি তোমার সাধনায় সিদ্ধিলাভ করতে পেরেছ। দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়, উঠানে পুঁতে রাখা কাঠের লাঠির মাথায় কচি সবুজ পাতা গজাতে দেখা যায় না। একদিন নিজাম হঠাৎ শুনতে পান একজন নারীর আর্তচিৎকার। তিনি তার বাড়ি থেকে বেরিয়ে দেখতে পান কোনো এক ব্যক্তি একজন নারীর সম্ভ্রম হরণ করতে যাচ্ছে। নিজাম রেগে গিয়ে খুন করে বসেন লোকটিকে। লোকটিকে খুন করে নিজামের মনে খুব অনুশোচনা হয়। কিন্তু ঘরে ফিরে তিনি দেখতে পান শেখ ফরিদের লাঠির মাথা ভরে উঠেছে সবুজ কচি পাতায়। এ হলো নারীর সম্মান রক্ষার মুসলিম চেতনা। নিজাম ডাকাতের কাহিনী সাধারণ পয়ারছন্দে লেখা, যা গ্রাম্য গল্পকথকেরা একসময় গ্রামে গ্রামে গান গেয়ে শুনিয়ে বেড়াতেন। গল্প বলা ছিল এক দল মুসলিম কথকের জীবিকার উপায়।

এ থেকে বোঝা যায় গ্রামবাংলার সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে। কিন্তু আজ এই ঐতিহ্যকে যেন ঢেকে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। গড়া হচ্ছে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে আমরা যা শিখেছি, তা থেকে অনেক বেশি শিখেছি গ্রামবাংলার মুসলিম গ্রাম্য কথকদের কাছ থেকে। ময়মনসিংহ গীতিকায় সঙ্কলিত অনেক কাহিনীর রচকদের নাম পাওয়া যায়, যাদের বেশির ভাগই হলেন মুসলমান। দ্বিনেশচন্দ্র সেন যখন এইসব কাহিনী সঙ্কলিত করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশ করতে চান, তখন তাকে হতে হয়েছিল যথেষ্ট বাধার সম্মুখীন। অনেকে প্রশ্ন তুলেছিলেন, এসব গ্রাম্য মুসলিম কবিদের রচনা হিন্দু সমাজ জীবনে কোনো প্রভাব ফেলেনি। এগুলো হলো চাষাভূষার কাহিনী; ভদ্রলোকের কাহিনী এসব নয়। দ্বিনেশচন্দ্র সেন এসব কথা লিখে গেছেন তার সঙ্কলিত ময়মনসিংহ গীতিকার ভূমিকায়, ১৯৩০-এর দশকে।


এ বছর পয়লা বৈশাখে যা ঘটেছে, তাকে নিয়ে বিশেষভাবে রাজনীতির চেষ্টা করা হচ্ছে। দোষ দেয়া হচ্ছে মুসলিম মৌলবাদীদের। কিন্তু মুসলিম মৌলবাদ বলতে আসলে ঠিক কী বুঝতে হবে, সেটা থাকছে উহ্য। প্রতি বছর বহু মুসলমান বিশ্বের নানা দেশ থেকে মক্কায় যান হজব্রত পালন করার জন্য। হজব্রত পালনের সময় কাবা শরিফকে সাতবার প্রদক্ষিণ করতে হয়। এই প্রদক্ষিণের সময় কোনো সেলাই করা জামা পরা চলে না। নরনারী একত্রে হজব্রত পালন করেন। প্রদক্ষিণ করেন কাবা শরিফকে। কাবা শরিফকে প্রদক্ষিণ করার সময় মেয়েদের মুখ ঢাকার নিয়ম নেই। কাবা শরিফ প্রদক্ষিণ করার সময় মেয়েদের মুখমণ্ডল রাখতে হয় উন্মুক্ত। কিন্তু ওই বিশাল ভিড়ে কাবা শরিফ প্রদক্ষিণের সময় কোনো নারীকে হতে হয় না যৌন হয়রানির শিকার। মুসলিম মৌলবাদ নারীকে অশ্রদ্ধা করতে শিক্ষা প্রদান করে না। ইসলামের ধর্মপ্রণালী তা নয়। কিন্তু এখন প্রচার করা হচ্ছে যে, মুসলিম মৌলবাদীরাই নাকি করছেন নারীদের অসম্মান। যদি কোনো মুসলমান এটা করেই থাকেন তবে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে তাকে বলা যেতে পারে না মুসলিম মোৗলবাদী। কেননা, মুসলিম মৌলবাদীরা কোনোভাবেই নারীর অসম্মান করতে পারেন না ধর্মীয় কারণেই।


ইসলাম ধর্ম ও হিন্দু ধর্মের মধ্যে বড় রকমের পার্থক্য বিদ্যমান। আমার কিশোর বয়সে আমাদের বসতবাটির কাছেই ছিল একজন হিন্দু পানওয়ালার দোকান। সে দোকানে একটা কাচের ফ্রেমে বাঁধাই করা বড় ছবি ছিল। ছবির বিষয় ছিল শ্রীকৃষ্ণ বসে আছেন একটি কদমগাছের শাখায়। গাছের কাছেই একটি সরোবরে স্নান করছেন গোপীরা। কিন্তু তারা পানি থেকে উঠতে পারছেন না, কারণ সরোবরের ধারে তাদের খুলে রাখা বস্ত্রগুলো নিয়ে শ্রীকৃষ্ণ ঝুলিয়ে রেখেছেন কদমগাছের শাখায়। এই ছবিটি ছিল শ্রীকৃষ্ণের বস্ত্রহরণের কাহিনীভিত্তিক। শ্রীকৃষ্ণকে ধরা হয় বিষ্ণুর অবতার হিসেবে। বৈষ্ণবরা শ্রীকৃষ্ণের ভক্ত। তারা মনে করেন ভগবদ প্রেমের জন্য নারীপ্রেমের প্রয়োজন। নারী প্রেমের মাধ্যমে আসে ভগবদ প্রেমের উপলব্ধি। কেবল তাই নয়, নিজ স্ত্রীর সাথে প্রেমের চেয়ে পরস্ত্রীর সাথে প্রেম হলো অনেক গভীর। পরকীয়া তাই নিজকীয়ার থেকে ধর্ম সাধনার ক্ষেত্রে অধিক উপযোগী। শ্রী রাধা ছিলেন সম্পর্কে শ্রীকৃষ্ণের মামী। ইসলামে বহুবিবাহের স্বীকৃতি থাকলেও ব্যভিচারের স্বীকৃতি নেই। মুসলমানরা মনে করেন না, পরস্ত্রীর প্রেমের মাধ্যমে আল্লার প্রেমে মগ্ন হওয়া চলে। শোনা যাচ্ছে পয়লা বৈশাখে নাকি হয়েছে বস্ত্রহরণ। যদি এটা হয়েই থাকে, তবে এটাকে বলা চলবে বৈষ্ণব পদ্ধতি; কোনো মুসলিম পদ্ধতি নয়।

আমি হিন্দুধর্মকে খাটো করতে চাচ্ছি না। কিন্তু বৈষ্ণব সাহিত্য পাঠ করলে দেখা যাবে, যা বলছি তা বানোয়াট নয়। সাম্প্রদায়িক মনোভাবপ্রসূতও নয়। ক’দিন আগে রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতা ঢাকায় অভিনীত হলো। রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতায় বলা হয়েছে লাবণ্য হলেন দীঘির জল, তাতে সাঁতার কাটতে হবে। অন্য দিকে কেতকী হলেন ঘড়ার জল। যা পান করতে হবে। রবীন্দ্রনাথের প্রেমের আদর্শ দুই রকম। কতকটা নিজকীয়তা ও পরকীয়তার মতো। কেতকীকে ভালোবাসা হলো নিজকীয়তা আর লাবণ্যকে ভালোবাসা হলো যেন পরকীয়তা। জানি না, আমাদের দেশের মেয়েদের সামনে এসব আদর্শ তুলে ধরে তাদের মধ্যে যৌন বিকার সৃষ্টির সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে কি না? ইসলামে বলা হয়েছে বিবাহিত জীবনযাপন করতে, সংসার ধর্ম প্রতিপালন করতে। রোমান্টিক প্রেমে গা ভাসাতে নয় (আল কুরআন : সূরা ২৪ : ৩২-৩৩)।

ইসলামে গড়ে ওঠেনি বৈষ্ণব সাহিত্যের মতো কোনো সাহিত্য। বর্তমানে নববর্ষ প্রতিপালন করতে যেয়ে অনুকরণ করা হচ্ছে হিন্দুয়ানীর; জ্বালানো হচ্ছে মঙ্গল প্রদীপ; যার ফলে মুসলিম সমাজেও হয়তো ঢুকে পড়তে থাকবে পরকীয়া সাধনার ধারা। আমি মুসলমান মেয়েদের বলব, মা তোমরা ইসলামি জীবনবিধান অনুসরণ করো। তাহলে তোমাদের জীবনে কমবে যৌন হয়রানির সম্ভাবনা।


ছাত্র ইউনিয়ন দেশে একটি নতুন ছাত্র সংগঠন নয়। তারা বর্ষবরণের দিনে সংঘটিত নারী হয়রানি নিয়ে করতে চাচ্ছে আন্দোলন। এই আন্দোলন করতে যেয়ে তাদের নারীকর্মী পুলিশ কর্তৃক হলেন প্রহৃত। বিষয়টি নিয়ে পত্রপত্রিকায় অনেক হইচই হতে দেখলাম। আমার মনে পড়ছে ১৯৭৩ সালের ১ জানুয়ারির কথা। ছাত্র ইউনিয়নের ছেলেরা ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রতিবাদ করে ঢাকায় করেছিল ছাত্র মিছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল ঢাকার মার্কিন তথ্যকেন্দ্রে আগুন লাগানো। শেখ মুজিব-প্রশাসন এটা জানতে পেরে ছাত্র মিছিলের ওপর গুলি চালনার হুকুম প্রদান করেন; যাতে দুইজন ছাত্র নিহত হন। আর গুরুতরভাবে আহত হন ছয়জন। ছাত্র ইউনিয়নের মিছিলের ওপর হামলার ঘটনা এই প্রথম নয়। এবার ছাত্র ইউনিয়নের মিছিলের ওপর হতে পারলো আবার পুলিশের হামলা। এখনো আওয়ামী লীগ সরকার আছে ক্ষমতায়। কেন এ রকম হামলা করা হলো আমরা তা জানি না। এর মূলে থাকতে পারে কোনো নিগূঢ় কারণ।

ছাত্র ইউনিয়নের নেতারা বক্তৃতা দিচ্ছেন পুরনো বাগধারায়। গালি দিচ্ছেন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে। কিন্তু এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সাম্রাজ্যবাদী বলে রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা লাভের কোনো সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। বিরাট সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়েছে। রুশ ও ইউক্রেনীয়দের মধ্যে হচ্ছে যুদ্ধ। ইউক্রেনীয়রা রুশদের বলছে সাম্রাজ্যবাদী। যে ভিয়েতনামকে নিয়ে ছাত্র ইউনিয়ন মিছিল করেছিল, সেই ভিয়েতনাম এখন গ্রহণ করছে মার্কিন অনুদান। কেন তথাপি ছাত্র ইউনিয়ন পুরনো বাগধারায় কথা বলে ভাবছে রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা লাভ করতে পারবে, তা আমরা জানি না। মনে হচ্ছে ছাত্র ইউনিয়নের বাড়াবাড়ি, আওয়ামী লীগ ও বাম মোর্চার মধ্যে সৃষ্টি করবে বড় রকমের ব্যবধান। অন্য দিকে মুসলিম জনসমাজ থেকেও তারা হতে থাকবেন আরো বিচ্ছিন্ন।


লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট