খালেদা জিয়াকে কী নির্বাচনের বাইরে রাখা হবে?

Aug 12, 2017 06:15 pm
 ফের আন্দোলনই বিএনপির গন্তব্য



মঈন উদ্দিন খান

নতুন বছরে অর্থাৎ ২০১৮ সালের শুরু থেকেই কি পাল্টে যাবে রাজনীতি? সমীকরণ কিন্তু সহজ নয়। রাজনৈতিক সঙ্কট ঘনীভূত হওয়ার শঙ্কা উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে এখনই। কেউ কেউ আরেকটি এক-এগারো হতে পারে, এমন কথাও বলতে ছাড়ছেন না। আগামী বছর নির্বাচনী বছর। নির্বাচনকে ঘিরে বহু প্রশ্ন অমীমাংসিতই রয়ে গেছে। মাঠের বিরোধী দল বিএনপি এই অনিশ্চয়তা থেকে উত্তরণে সমঝোতা কিংবা আলোচনার টেবিলে যেতে চায়। তা না হলে ফের আন্দোলনই তাদের গন্তব্য। ইতোমধ্যে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে বিএনপি। নির্বাচন কমিশনের সাথে সংলাপে অংশ নিয়ে সুষ্টু নির্বাচনের জন্য রুপরেখো তুলে ধরেছে। যেখানে নির্বাচনকালীন সরকার ও সেনা মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। সুষ্টু নির্বাচনের ব্যাপারে আর্ন্তজাতিক মহল বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশ ভারতের দিক থেকেও ইতিবাচক ইঙ্গিত পেয়েছে বিএনপি।


তবে নির্বাচনমুখী বিএনপির সামনে অপেক্ষা করছে তাই কঠিন পথ। একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে দলটির দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত ইতিবাচক। কিন্তু তার আগে সুষ্ঠু নির্বাচনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত বিবদমান বেশ কয়েকটি ইস্যুতে রাজনৈতিক মতৈক্য চায় তারা। দলটি বলছে, নির্বাচনের মাঠ যেমন সমতল করতে হবে, তেমনি নির্বাচনকালীন সরকারের ধরন কেমন হবে তারও ফায়সালা করতে হবে। নির্বাচন-পূর্ব এসব দাবি আদায়ে দলটি সোচ্চার হবে, এটা প্রায় স্পষ্ট। আগামী বছরের শুরুর দিকে কঠিন আন্দোলনেরও পথও বেছে নেয়া হতে পারে।


একাদশ সংসদ নির্বাচনের বাকি এখনো দেড় বছর। কিন্তু সরকারি দল কৌশলে চলমান রাজনীতিকে নির্বাচনী আবরণ দিয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। আওয়ামী লীগ প্রধান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কয়েক মাস ধরেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে জনসভা করছেন। উন্নয়ন আর বিএনপির অতীত ব্যর্থতার কথা তুলে ধরে তিনি ভোট চাচ্ছেন নৌকার পক্ষে। শুধু তা-ই নয়, দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদেরও তিনি নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। নির্বাচনে পাস করার বিষয়ে দল কারো দায়িত্ব নেবে না বলেও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন তিনি। ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও প্রায় প্রতিদিনই নির্বাচন নিয়ে কথা বলছেন।

জানা গেছে, সরকারি দল আরেকটি একতরফা নির্বাচন করতে তেমন আগ্রহী নয়। সে কারণে বিএনপিকে আন্দোলনের চিন্তা থেকে সরিয়ে এনে নির্বাচনমুখী করতেই আগেভাগেই নির্বাচনের আবহ তৈরির এ কৌশল নেয়া হয়েছে। যাতে করে নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে বিএনপির তৃণমূল থেকেই দলের হাইকমান্ডের ওপর একটি চাপ সৃষ্টি হয়। নির্বাচন বর্জনের কোনো চিন্তা তারা চূড়ান্তভাবে করতে না পারে। এ কৌশলের মাধ্যমে বিএনপিকে নির্বাচনে এনে ‘সম্মানজনক’ কিছু আসন ধরিয়ে দেয়ার বিষয়টিও আছে রাজনৈতিক আলোচনায়।


নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি আদায় না হওয়ায় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করেছিল বিএনপি। ওই নির্বাচনে অংশ নেয়া সঠিক ছিল না ভুল ছিল, তা নিয়ে দলের ভেতরে দ্বৈধতা থাকলেও তা অতীত হিসেবে ধরে নিতে চায় দলটি। বিএনপির অভ্যন্তরে এখন আগামী নির্বাচন নিয়ে নানা ভাবনা কাজ করছে। নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে খুব একটা মাথাব্যথা নেই দলটির। নেতারা বলছেন, বিএনপিতে প্রার্থীর কোনো প্রভাব নেই। নির্বাচনে অংশ নিলে ‘ডু অর ডাই’ ধরে নিয়ে সাংগঠনিক সব সমস্যাও সমাধান হয়ে যাবে। নেতা-কর্মীরা সব ভেদাভেদ ভুলে এক কাতারে এসে দল মনোনীত প্রার্থীকেই বিজয়ী করার জন্য কাজ করবে।


বিএনপির চিন্তা মূলত অন্য জায়গায়। সেটি হচ্ছে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’। অনেক নেতাই মনে করেন, নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত আবেগাশ্রিত না হয়ে বাস্তবতার নিরিখেই নিতে হবে। নির্বাচনকালীন সরকার ও নির্বাচনের মাঠ নিরপেক্ষ না হলে, সে নির্বাচনে গিয়ে কার্যত কোনো লাভ হবে না। আর বিএনপিকেই নির্বাচনের সেই পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।


দলটির আশঙ্কা, নির্বাচন যতই সামনে এগিয়ে আসবে বিএনপি ঘিরে সরকারি দলের কূটকৌশলও তত বাড়বে। বিএনপিকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে দিতে চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে নির্বাচন থেকে মাইনাস করা হতে পারে বলে তারা ধারণা করছেন। সে ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সঙ্কট আরো ঘনীভূত হতে পারে।


বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার বিচারকাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। দলটির কমপক্ষে ৫০ জন শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে মামলা চলমান রয়েছে, চার্জশিটও দেয়া হয়েছে। বিশেষ ট্রাইব্যুনালেও অনেক মামলার বিচার চলছে। কোনো কোনো নেতার বিরুদ্ধে স্থগিত মামলা ফের চালু হচ্ছে। বিএনপির আশঙ্কা শীর্ষপর্যায়ের বহু নেতাকে আগামী নির্বাচনে অযোগ্য করতেই সরকার মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিচ্ছে।


নির্বাচনের পথে আগামী দিনগুলোই বিএনপির জন্য মূল চ্যালেঞ্জের। নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবি আদায় না করে ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর হলে কাজের কাজ কিছুই হবে না। বিএনপির নেতারাই বলছেন, গোলটেবিল আর সেমিনার দিয়ে দাবি আদায় করা সম্ভব নয়। সব ভয় উপেক্ষা করে রাজপথে নামতে হবে। তা হলেই কেবল আগামী নির্বাচন নিয়ে সরকার যে নীলনকশা তৈরি করছে, তা নস্যাৎ করে দেয়া যেতে পারে।


আগামী নির্বাচন নিয়ে বিএনপি বেশ সতর্কভাবেই এগোচ্ছে। নির্বাচনের প্রতি অতি উৎসাহ দেখানোর পক্ষপাতী নয় তারা। সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্লেষণ করেই ধাপে ধাপে নতুন সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। নির্বাচন এখনো অনেক দূরে থাকায় দলটি দাবিদাওয়ার মধ্যেই আরো কয়েকটি মাস পার করতে চায়। পরিকল্পনা অনুযায়ী এ বছরের শেষ দিকে অথবা নির্বাচনী বছরের মার্চ-এপ্রিলে কর্মসূচির ধরন আমূল পাল্টে ফেলতে পারে বিএনপি। আন্দোলনের ধরন হতে পারে ২০১৪ এবং ২০১৫ সালের মতোই চরম সাংঘর্ষিক।



গত ১৫ জুলাই চিকিতসার জন্য লন্ডনে যান বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। দেশে ফিরে তিনি ততপর হয়ে উঠেছেন। আদালতে হাজিরা দিয়ে দেশের পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য রেখেছেন। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে বৈঠক করেছেন। রোহিঙ্গাদের দেখতে ককসবাজার যাওয়ার কর্মসূচী ঘোষনা করেছেন। নেতাকর্মীদের সক্রিয় করার কর্মসূচী নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন।


বিগত বছরগুলোতে বিএনপি নিয়ে কাটাছেঁড়া কিংবা দলটিতে ভাঙন ধরানোর নানা চেষ্টা হয়েছে। এক-এগারোর সময়ে এ ধরনের প্রয়াস ছিল উল্লেখ করার মতো। যদিও খালেদা জিয়া নেতৃত্বাধীন বিএনপি আছে আগের মতোই ঐক্যবদ্ধ, অটুট। কেউ কেউ বলছেন, নির্বাচন ঘনিয়ে এলেই রাজনৈতিক ‘চাল’ বেড়ে যায়। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগেও বিএনপির একটি অংশকে নির্বাচনে আনা যায় কি না সে চেষ্টা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সামনে এখন একাদশ সংসদ নির্বাচন। বিএনপি ঘিরে নানা তৎপরতা তাই অস্বাভাবিক কিছু নয়!