আফ্রিকার জঙ্গলে যা দেখলেন এক বাংলাদেশি

Aug 07, 2017 09:51 pm
আফ্রিকার জঙ্গল

 
কাজী জহিরুল ইসলাম


আফ্রিকায় থাকি, জঙ্গল দেখব না? একদিন এক জঙ্গলে ঢুকে পড়লাম। সাথে এক মিলিটারি অফিসার। অফিসারের নাম বোয়ি। বোয়ির বাড়ি টোগো। ওদের কাছে আইভরিকোস্ট এক স্বর্গের নাম। এখানকার বন-জঙ্গল হলো স্বর্গের বাগান। আমরা যখন স্বর্গের বাগানে ঢুকি তখন বেলা এগারোটা। ভেতরে ঢুকে মনে হলো সন্ধ্যা সমাগত, রাত্রি আসন্ন। আমরা এখনো গাড়িতে। দু’পাশের উঁচু বৃক্ষসারির জন্য এই অরণ্যপথে সূর্যের আলো পড়ছে না। আমি গাড়ি চালাচ্ছি। বোয়ি বলল, হেডলাইট জ্বালিয়ে দাও। বেলা এগারোটার সময় প্রাডোর হেডলাইট জ্বালিয়ে আমরা অরণ্য দর্শনে বেরিয়েছি।


লাল মাটির রাস্তায় কঙ্কর বিছানো। গোল গোল মার্বেলের মতো মসৃণ কঙ্কর। খুব সাবধানে গাড়ি চালাতে হচ্ছে। কঙ্করের রাস্তা খুবই বিপজ্জনক। যেকোনো সময় চাকা পিছলে যেতে পারে। যতই সামনে এগোচ্ছি, রাস্তা ততই সরু হয়ে আসছে। বোয়ি, আমরা কোথায় যাচ্ছি? আমার এ প্রশ্নে বোয়ি কোনো উত্তর দিলো না। বিষয় কী? আমরা কি তাহলে কোনো বিপজ্জনক জায়গায় এসে পড়লাম? অনেকক্ষণ পর বোয়ি মুখ খুলল, মনে হয় গাড়ি ঘোরাতে হবে। আমরা সম্ভবত ভুল পথে এসেছি। সামনে কোনো ওয়ে আউট আছে বলে মনে হচ্ছে না। আমি বললাম, আরো খানিকটা যাই। সরু হতে হতে রাস্তা একসময় গাড়ির সমান হয়ে গেল।

দু’পাশের গাছের ডালপালায় ক্রমাগত বাড়ি খাচ্ছে গাড়ি। ইউন্ডশিল্ড এবং দু’পাশের দরোজায় সবুজ পাতা আর হলুদ ফুলের রঙ। গাড়িটাকে এখন দেখাচ্ছে চিত্রা হরিণের মতো। চিত্রা হরিণ আর এগোতে পারবে না। কারণ সামনে এক সরু নদী। সেই নদীর ওপর একটি কাঠের সেতু। আমরা গাড়ি থেকে নামলাম। আমার গা ছমছম করছে। জনমানবশূন্য এই নির্জন অরণ্যে কোনো হিংস্র জন্তু থাকা মোটেও অস্বাভাবিক কিছু নয়। বোয়ি বলল, চলো এগিয়ে দেখি সেতু পেরুনো যাবে কি না? আমি ওর প্রশ্নটি বুঝেছি কি না সেটাই বুঝলাম না। সেতু পেরোনো যাবে কি না মানে কী? এই কাঠের সেতুর ওপর দিয়ে গাড়ি নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছে ও? আমি গাড়ি ছেড়ে নড়লাম না। মাটিতে পা রেখে গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। বাঁ হাত দরোজার হাতলে। বিপদ দেখলেই যাতে লাফ দিয়ে গাড়ির ভেতর ঢুকে যেতে পারি।


দশ মিনিট পর বোয়ি ফিরে এসে জানালো, যাওয়া যাবে। গাড়িতে ওঠো। নদীর ওপারে আরো পনের কিলোমিটার গাড়ি চালালেই আমরা সান-পেদ্রোর বড় রাস্তায় উঠে যাবো। আমি বললাম, মাফ করো বাপ। গাড়ি ঘোরাই, ফিরে চলো। আমার জঙ্গল দেখার সাধ মিটে গেছে। কোনো কারণে যদি কাঠের সেতু ভেঙে নিচে পড়ি শুধু জানটাই যাবে না, সাথে মানসম্মান সবই যাবে। এমনিতেই নিরাপত্তা-নির্দেশিকা ভেঙে কাউকে না জানিয়ে জঙ্গলে ঢুকেছি। সিকিউরিটি বিভাগ জানতে পারলে বিরাট কেলেঙ্কারি হবে। বোয়ি, খিক খিক খিক করে পিত্তি জ্বালানো একটা হাসি দিয়ে বলল, পাশের সিটে বসো।

আমি বললাম, তোমার কি মাথা খারাপ? আমি কিছুতেই তোমাকে এই নড়বড়ে ব্রিজে গাড়ি তুলতে দেবো না। ও বলল, শোনো, তোমার কোনো ভয় নেই। আমার লাইসেন্স পাঞ্চ করে চালাব। যা হওয়ার আমার হবে। ওর এই অদৃশ্য সাহসের কাছে নিজেকে কাওয়ার্ড লাগছে। ভয়টা লুকিয়ে বললাম, ঠিক আছে। কিন্তু আমি গাড়িতে উঠব না। তুমি ওপারে পৌঁছলে তারপর আমি হেঁটে হেঁটে পার হবো। অনুমতি তো ওকে দিলাম। এখন যদি গাড়ি নিয়ে ও নিচে পড়ে, আমি কি দায় এড়াতে পারব? তা ছাড়া এখান থেকে ফিরেইবা যাবো কী করে? মনে মনে আল্লাহকে ডাকছি।


গাড়ি ঠিকই নদী পার হয়ে গেল। আমি হেঁটে হেঁটে ব্রিজ পার হওয়ার সময় দেখি নিচে একদল নারী-পুরুষ উদোম হয়ে নদীতে স্নান করছে। বেশির ভাগই নারী। কেউ কেউ বক্ষ উন্মুক্ত রেখে নির্র্দ্বিধায় কাপড়চোপড় ধোয়াধোয়ি করছে। একটা মরা নদী। কোনো বেগ নেই, গতি নেই। পানির রঙও কালচে, খুবই নোংরা মনে হলো। সেই নোংরা পানিতেই ওরা স্নান করছে। এই মানুষগুলোকে দেখে অনুমান করছি ধারে-কাছে কোথাও লোকালয় আছে। ব্রিজ পার হয়ে আমরা গাড়ি থামালাম।

ব্রিজ পেরুনোর পর কোনো এক বিচিত্র উপায়ে আমার সাহস জ্যামিতিক হাড়ে বাড়তে শুরু করেছে। বর্ধিত সাহসের ঝুলিটা কাঁধে নিয়ে এক লাফে নেমে পড়লাম গাড়ি থেকে। নেমেই সোজা লাল মাটির কঙ্কর ছড়ানো ঢাল বেয়ে ব্রিজের নিচে, একেবারে একদল অর্ধনগ্ন মানুষের ভিড়ের ভেতর। বোয়ি গাড়ির বনেটের ওপর হেলান দিয়ে অবাক বিস্ময়ে দেখছে আমার কাণ্ডকারখানা। আমাকে দেখে মেয়েদের কেউ ওদের অনাবৃত বক্ষ ঢাকার চেষ্টা করছে না। দ্বিধা, শঙ্কা কিংবা বিস্ময় কিছুই নেই ওদের চোখেমুখে। ক’জন কিশোরীও আছে এদের দলে। ওদের এই নির্লজ্জ ভাব দেখে আমিই লজ্জা পেতে শুরু করেছি।

একজন মধ্যবয়স্ক লোক পানিতে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে। নিজের জড়তা দূর করতেই আমি লোকটির বাহু টেনে ধরি। তারপর ওকে টেনে এক পাশে সরিয়ে এনে বলি, আমরা পথ হারিয়ে ফেলেছি, সান পেদ্রো যাবো কিভাবে? লোকটি আমার কথা কিছুই বুঝল না। কারণ ও ইংরেজি জানে না। এবার আমার ফরাসি জ্ঞান যেটুকু আছে তা উজাড় করে, হাত-পা ছুড়ে ওর সাথে কিছু কথোপকথনের চেষ্টা করলাম। লোকটির নাম আমানি, কৃষক। এখান থেকে দুই কিলোমিটার উত্তরে ওদের গ্রাম, আল্লাকু। গ্রাম মানে জঙ্গল সাফ করে মাটির ঢেলা দিয়ে বানানো তের-চৌদ্দটি ঘর। ওপরে পাম পাতার ছাউনি।

এই শীর্ণ মৃতপ্রায় নদীটিই জলের একমাত্র উৎস। আমি যখন আমানির সাথে গল্প জমানোর চেষ্টা করছি তখন এক কিশোর একটি কোশা নৌকা বেয়ে উজানের দিক থেকে, ঝোপ-জঙ্গলের আড়াল ফুড়ে উদয় হলো। ওর দুই পাটি দাঁতে গাছ-লতার ফাঁক চুঁইয়ে নেমে আসা আলোর ঝিলিক। ছেলেটি নৌকা ভিড়িয়েই একটি জালিব্যাগভর্তি পাঁচমিশালি মাছ নিয়ে নেমে এলো। খুশি উপচে পড়ছে ওর চোখেমুখে। সমবেত নারী-পুরুষেরা কোরাস সঙ্গীতের মতো আনন্দে হৈ হৈ করে উঠল। ক’জন অর্ধনগ্ন কিশোরী আকাশের দিকে তাকিয়ে উলুধ্বনি দিতে শুরু করেছে।


আমানি আমাকে অতিক্রম করে এগিয়ে গেল কিশোরের ব্যাগভরা মাছের কাছে। ব্যাগটা ও একরকম ছেলেটির কাছ থেকে ছিনিয়ে এনে আমার মুখের কাছে উঁচু করে তুলে ধরে বলল, নেবে? আমি দাম জানতে চাইলে ও বলল, পাঁচ হাজার সিফা। আমি কোনো দরদাম না করেই পাঁচ হাজার সিফা আমানির হাতে দিয়ে ব্যাগটা নিয়ে উঠে এলাম মেঠোপথটিতে, গাড়ির কাছে। একদম তাজা মাছ কিনতে পেরে আমিও দারুণ খুশি। গাড়িতে উঠতে যাবো, বোয়ি আমাকে আঙুল তুলে দেখাল সেই কিশোরটিকে, ও তখনো আমার হাতে ঝোলানো ওর মাছের ব্যাগটির দিকে তাকিয়ে আছে।

আমার মনে হলো, পাঁচ হাজার সিফা হয়তো ওর পরিবারের কাছে অনেক কিছু কিন্তু যে আনন্দ নিয়ে ও মাছগুলো ধরে এনেছে এই সামান্য পয়সায় সে আনন্দটুকু কিনে ফেলা অন্যায়, খুবই অন্যায়। আমি আবার ফিরে গেলাম। মাছের ব্যাগটি ওর হাতে তুলে দিতেই ও সাগ্রহে তা গ্রহণ করল। কিন্তু আমানি, সম্ভবত ওর বাবা, ওকে তেড়ে মারতে এলো, সে কিছুতেই এই টাকাটা হারাতে চায় না। আমি ওকে আশ্বস্ত করলাম, টাকাটা ফেরত দিতে হবে না, রেখে দাও।


আরো ছয়-সাত কিলোমিটার পথ পেরিয়ে এসেও রাস্তার আশপাশে কোনো গ্রামের চিহ্নও চোখে পড়ল না। আমি এখন পুরোপুরি অ্যাডভেঞ্চার মুডে আছি। বোয়িকে বললাম, গাড়ি থামাও। জঙ্গলটা একটু ঘুরে দেখি। রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালিয়ে চলে গেলে তো আর কিছুই দেখা হলো না। আমরা পথের ওপর গাড়ি থামিয়ে নেমে পড়লাম। বোয়ি ওর ইউনিফর্ম খুলে গাড়িতে রাখল। এখন ওর পরনে হাতা-কাটা একটি হলুদ গেঞ্জি। ডান দিকের জঙ্গল কিছুটা হালকা। দু’জন দুটি কোকের ক্যান হাতে নিয়ে হালকা জঙ্গলে ঢুকে পড়লাম।


কিছুদূর এগোতেই বোয়ি চিৎকার করে উঠল। কি হলো? ও বলল, নাজা, নাজা। জলদি গাড়িতে যাও। দুই বোতল পানি নিয়ে এসো। আমি কোনো কিছু না বুঝেই ছুটলাম গাড়িতে। দুই বোতল আওয়া নিয়ে এলে ও নিজের বাহুটা দেখিয়ে বলল, এখানে ঢালো। আমি ওর বাহুতে পুরো দুই বোতল পানি ঢাললাম। তখনো ওর মুখ বিকৃত। আমি বললাম, কী হয়েছে? ও বলল, নাজা। আমি বললাম, নাজা কী? ও বলে, থুথু গোখরো। আমরা দু’জনই তখন ওপরে তাকালাম।

মাই গড, গাছের ডালে ডালে ঝুলে আছে একদল ভয়ঙ্কর কালো রঙের স্পিটিং কোবরা। এই থুথু হলো কোবরার বিষ। ভাগ্যিস ওর বাহুতে পড়েছিল। যদি চোখে পড়ত তাহলে সে অন্ধ হয়ে যেত। গোখরোর থুথু যদি কারো গায়ে পড়ে আর সেখানে যদি কোনো ক্ষত থাকে তাহলে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। অতি দ্রুত চিকিৎসা না পেলে সে নির্ঘাত মারা যাবে। বেশ কয়েকজন বাঙালি সৈনিক এই থুথু গোখরোর কবলে পড়েছিল।
আমরা অতি দ্রুত গাড়িতে উঠে আবিদজানের পথে রওনা হয়ে গেলাম।