নির্বাচনের আগাম প্রস্তুতি আওয়ামী লীগের

May 19, 2017 11:36 am
প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা


জাকির হোসেন লিটন


সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান সংসদের মেয়াদ শেষ হবে ২০১৯ সালের ১১ জানুয়ারি। আর ১১ জানুয়ারির পূর্ববর্তী ৯০ দিন অথবা পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। তবে নির্বাচনের জন্য যতটুকু প্রস্তুতি থাকার দরকার, দুই বছর আগেই তার প্রায় সবই সেরে নিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এখন চলছে নির্বাচনী প্রচারের কার্যক্রম। এ ছাড়া ইশতেহার তৈরির কাজও শেষপর্যায়ে। দলের ২০তম জাতীয় সম্মেলনের ঘোষণাপত্র মাথায় নিয়ে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহার তৈরি হচ্ছে।

সে ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের বড় বড় সাফল্য তুলে ধরার পাশাপাশি ভোটারদের আকৃষ্ট করতে ভবিষ্যৎ কিছু পরিকল্পনাও ইশতেহারে যুক্ত হবে। তবে দলটির সার্বিক কার্যক্রমে আগাম নির্বাচনের খানিকটা আভাস পাওয়া যাচ্ছে।শুধু সরকারি দলই নয়, নির্বাচন কমিশনও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের একটি ‘রোডম্যাপ’ প্রস্তুত করেছে। অপর দিকে, বিএনপির পক্ষ থেকেও নির্বাচনের প্রস্তুতি রয়েছে বলে জানা গেছে।


নির্বাচন কমিশন সূত্র বলছে, একাদশ সংসদ নির্বাচনের খসড়া রোডম্যাপে চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের মধ্যে রাজনৈতিক দল-সুশীলসমাজের সাথে সংলাপ, ডিসেম্বরের মধ্যে ৩০০ সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণের সময়সীমা রাখা হচ্ছে। ২০১৮ সালের ৩১ জানুয়ারি ভোটার তালিকা চূড়ান্ত করা, ফেব্রুয়ারির মধ্যে নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন সম্পন্ন করা এবং সংসদ নির্বাচনে ব্যবহারের জন্য ডিজিটাল মেশিন প্রস্তুতের সময়সীমা (টাইম ফ্রেম) নির্ধারণ করে দেয়া হচ্ছে রোডম্যাপে। রোডম্যাপ বা কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী একাদশ সংসদ নির্বাচনের জন্য ভোটকেন্দ্র প্রস্তুত করা, মালামাল সংগ্রহ, ভোটের আগে দ্বিতীয় দফায় রাজনৈতিক দলের সাথে সংলাপ, নির্বাচনী আইন সংশোধনসহ বেশ কিছু বিষয় অগ্রাধিকার দেয়া হবে বলে নির্বাচন কমিশন সচিবালয় সূত্র বলছে।


আওয়ামী লীগের সূত্রগুলো বলছে, জাতীয় নির্বাচনের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত ক্ষমতাসীন দলটি। নির্বাচনের প্রয়োজনীয় কাজগুলো ইতোমধ্যে প্রায় সেরে ফেলেছে তারা। এখন চলছে প্রচার ও ইশতেহার তৈরির কাজ। তারই অংশ হিসেবে দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন জেলা সফর করছেন। সফরকালে আগামী নির্বাচনে দলীয় প্রতীক নৌকায় ভোট দেয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন তিনি। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারেও এবার গুরুত্ব দিচ্ছে দলটি। সেই লক্ষ্যে দলীয় এমপিদের প্রশিক্ষণও দেয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই আওয়ামী লীগ ও সরকারের সব কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। নির্বাচনের বিষয়টি মাথায় রেখেই প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন ও সরকারি কর্মসূচিগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। মন্ত্রী, এমপি, জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্বাচনমুখী হওয়ার নির্দেশনাও দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী।

নির্বাচনের প্রাথমিক প্রস্তুতি ইতোমধ্যেই সেরে ফেলা হয়েছে। সরকারি দু’টি সংস্থার মাধ্যমে সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে ইচ্ছুক প্রার্থী ও বর্তমান এমপিদের বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। পাশাপাশি দলীয় মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহের কাজও শেষপর্যায়ে। দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায় নিয়মিত চোখ বুলাচ্ছেন। সে জন্য নির্বাচন সামনে রেখে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। নির্বাচন সামনে রেখে কোন্দল মেটাতে বিভিন্ন জেলার নেতাদের সাথে বৈঠক করছেন দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। এসব বৈঠকে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগ পর্যন্ত সব বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি।


দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা জানান, আওয়ামী লীগ বেশ আগ থেকেই জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছে। বিশেষ করে গত বছর অক্টোবর মাসে অত্যন্ত জাঁকজমকভাবে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দুই দিনব্যাপী দলের ২০তম জাতীয় সম্মেলন সফলভাবে শেষের মধ্য দিয়েই এ প্রস্তুতি শুরু করে ক্ষমতাসীনেরা। কাউন্সিলে নেতাকর্মীদের জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি ও সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড প্রচারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন দলীয় সভাপতি। এ ছাড়া কাউন্সিলের পর থেকেই আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিয়ে আসছেন। পাশাপাশি দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সিনিয়র নেতারা বিভিন্ন জেলায় সংবর্ধনায় যোগ দিয়ে জাতীয় নির্বাচনের জন্য সর্বাত্মক প্রস্তুতির আহবান জানান।

মূলত গত ২৬ ফেব্রুয়ারি উত্তরবঙ্গের অন্যতম জেলা এবং বিএনপির দুর্গ বলে পরিচিত বগুড়া থেকে নির্বাচনী প্রচারের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করে আওয়ামী লীগ। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ওই দিন বগুড়ায় দলীয় জনসভায় আগামী নির্বাচনে নৌকা মার্কায় ভোট দিতে সরাসরি জনগণের প্রতি আহ্বান জানান। এরই ধারাবাহিকতায় নির্বাচনের আগ পর্যন্ত সারা দেশে জনসভার কর্মসূচি হাতে নিয়েছে দলটি। তারই অংশ হিসেবে কক্সবাজার, লক্ষ্মীপুর, মাগুরা ও ফরিদপুরে জনসভার কাজ সেরেছেন প্রধানমন্ত্রী। এরই মধ্যে ঠাকুরগাঁও, বরগুনা ও চুয়াডাঙ্গায় প্রধানমন্ত্রীর সফরের কথা থাকলেও আপাতত সেটি স্থগিত করা হয়েছে।


গত ২৩ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ ভবনে আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের সভা থেকে সব এমপিকে নির্বাচনী প্রচারে মাঠে নামার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। একই সাথে বিতর্কিত এমপিদের সতর্ক করে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, কে কী করছে আমার কাছে সব রিপোর্ট আছে। আগামী নির্বাচনে বিতর্কিতদের মনোনয়ন দেয়া হবে না। এর পর থেকেই সরকারের মন্ত্রী, এমপি ও দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতারা যার যার নির্বাচনী এলাকা চষে বেড়াচ্ছেন। অনেকে সপ্তাহের বেশির ভাগ সময়ই নিজ নিজ এলাকায় ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। বিশেষ করে শুক্র ও শনিবারসহ সব ছুটির দিনে নিজ নিজ এলাকা চষে বেড়াচ্ছেন তারা। অন্য দিকে প্রধানমন্ত্রীও আগামী নির্বাচনের জন্য দলের সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকা ধীরে ধীরে ছোট করে নিচ্ছেন। সরকারের সার্বিক কার্যক্রম আগাম নির্বাচনেরই ইঙ্গিত বলে মনে করছেন অনেকে। তবে বিষয়টি এড়িয়ে দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেছেন, গত অক্টোবরে দলীয় কাউন্সিলেই আমাদের সভানেত্রী নেতাকর্মীদের নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন।

সেই নির্দেশনার আলোকে আমরা সারা দেশে যার যার মতো করে চষে বেড়াচ্ছি। আর প্রধানমন্ত্রীর জনসভাগুলোও নির্বাচনী প্রচারের অংশ। নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডগুলোকে জনগণের সামনে তুলে ধরার জন্য নিয়মিতভাবে জনসভার আয়োজন এবং এমপিদের প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। নির্বাচনী ইশতেহারসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজও শেষপর্যায়ে রয়েছে। প্রাথমিকভাবে প্রার্থী বাছাই করার কাজও সারছেন দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সব মিলিয়ে নির্বাচনের প্রাথমিক কাজগুলো আমাদের শেষ হয়েছে। এখন যেকোনো মুহূর্তে নির্বাচনের জন্য আমরা প্রস্তুত।