কেমন আছে সিরিয়া

Apr 20, 2017 10:36 am
আলেপ্পোর পতন ঘটেছে



আলেপ্পোর পতন ঘটেছে। সিরিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম এই নগরীর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছে প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের সরকার। পালিয়ে গেছে সরকারবিরোধী বিদ্রোহীরা, কিন্তু থেকে প্রশ্ন : ‘দেশটিতে পুনরেকত্রীকরণ কি সম্ভব হবে?’ এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে জার্মানির স্পাইগেল অনলাইনের সাংবাদিক ফ্রিৎস স্কাপ ঘুরে বেড়িয়েছেন সিরিয়ার এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত। হুমায়ুন সাদেক চৌধুরীর বাংলা ভাষান্তরে সেই কাহিনী

 

জানুয়ারির এক শীতার্ত সন্ধ্যা। স্থান : সিরিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী আলেপ্পোর পূর্বাঞ্চল। এক কসাইর দোকানে একটি ভাঙা ড্রামে আগুন জ্বলছে। তাকে ঘিরে আগুন পোহাচ্ছে পাঁচজন মানুষ। চার পাশে জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে যাওয়ার দগদগে ক্ষত।
পাঁচটি লোকেরই পরনের জামাকাপড় ভীষণ নোংরা। তাদের মুখেও কালিঝুলি মাখা, যেন কতকাল মুখে পানির ছোঁয়া লাগেনি। আসলেই তাই। এ এলাকায় পানি সরবরাহ বন্ধ বহু দিন থেকে।


প্রতিদিন সন্ধ্যায় লোকগুলো এখানে আসে। ধ্বংসস্তূপ থেকে টেবিল-চেয়ারের ভাঙা পায়া যা পায়, তা-ই কুড়িয়ে এনে তাতে আগুন ধরিয়ে শীত তাড়ায়। কারণ, তাদের অ্যাপার্টমেন্টে শীত তাড়ানোর কোনো ব্যবস্থা নেই।


এই দোকানটির মালিক আহমেদ তুবাল। ছোটখাটো মানুষ, কেমন যেন ক্লান্তিভরা দু’চোখ। তিনি বলেন, ‘এখন আর ভয় নেই। ভয় একেবারে পালিয়েছে।’ চার বছর ধরে এই ‘ভয়’ জেঁকে বসেছিল আলেপ্পো নগরীর ওপর। এ সময় নানা নামের বিদ্রোহী দল নিয়ন্ত্রণ করত তাদের আল শা’র এলাকা। সম্প্রতি সিরিয়া ও রাশিয়ার জেট বিমান থেকে তুমুল বোমাবর্ষণের মুখে ওরা লেজ গুটিয়ে পালাতে বাধ্য হয়। অবশ্য, এই বোমার আঘাতে আলেপ্পো নগরীর অর্ধেকাংশ একেবারে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।


সরকারি বাহিনীর বিজয়ের ফলে বিদ্রোহী ও তাদের সমর্থকেরা পালিয়ে গেছে, থেকে গেছে প্রেসিডেন্টবাশারের সমর্থকেরা। তাদেরই একজন আহমেদ তুবাল। রুশ-সিরিয়ান বোমায় অর্ধেক আলেপ্পো ধ্বংস হয়ে গেলেও আফসোস নেই তার। বলেন, ‘এই ইসলামপন্থীদের তাড়াতে এর (বোমাবর্ষণ) দরকার ছিল। নইলে জীবনেও ওদের তাড়ানো যেত না।’ তার কথায় সায় দেন আরেকজন, ‘আমাদের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। আমরা চাচ্ছিলাম, এসব (বিদ্রোহীদের তৎপরতা) বন্ধ হোক।

এর জন্য যদি সব ধ্বংস হয়ে যায় তো যাক, আমরা রাজি।’
তা-ই হয়েছে। রাশিয়া ও ইরানের সহায়তায় প্রেসিডেন্ট বাশারের সরকার দেশের বিরাট অংশকে ধ্বংসস্তূপ বানিয়ে হলেও নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করেছে। এই জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে যাওয়া দেশটিতে এসে আমাদের মনে হলো, আমরা যেন এক অলীক দুনিয়ায় ঢুকে পড়েছি। রাস্তায় রাস্তায় ধ্বংসস্তূপের ছড়াছড়ি, তারই মাঝখান দিয়ে টহল দিচ্ছে রুশ সৈন্য বোঝাই সাঁজোয়া যান। টেলিভিশন খুললেই ভেসে আসে প্রেসিডেন্ট বাশারের ছবি। আর দেশের অনেক মানুষের চোখেই আতঙ্কের ছায়া কাঁপতে দেখা যায় স্পষ্টভাবে।


আমাদের যাওয়ার কথা সিরিয়ার উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের তিনটি মহানগরীতে আলেপ্পো, লাতাকিয়া ও হোমস-এ। এর মধ্যে আলেপ্পো এখন নির্বিচার বোমাবর্ষণের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। ভূমধ্যসাগরীয় এলাকা লাতাকিয়া ছিল সরকারের শক্ত ঘাঁটি, যুদ্ধের বিভীষিকা একে ছুঁতেই পারেনি, বলা যায় এবং প্রতি গ্রীষ্মে এখনো এখানে প্রচুর পর্যটক ছুটি কাটাতে আসে। আর হোমস হচ্ছে সরকারবিরোধী বিদ্রোহের আঁতুড়ঘর। একসময় এটিকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হয়। আর এখন এটি হতে যাচ্ছে ‘পুনর্গঠনের মডেল’।


এখানে একটি কথা বলে নেয়া ভালো, বিদেশী সাংবাদিকেরা সিরিয়া সফরের অনুমতি পেলেও স্বাধীনভাবে সবখানে যেতে পারেন না। রাজধানী দামেস্ক থেকে তাদের যেসব জায়গায় যাওয়ার লিখিত অনুমতি দেয়া হয়, সেখানেই যেতে পারেন তারা। আর কথাও বলতে পারেন সরকারের কাছে গ্রহণযোগ্য কেবল এমন মানুষদের সাথে। এর বাইরে কারো সাথে কথা বলতে হলে সেটা গোপনেই সারতে হবে। সাধারণত সাংবাদিকদের সাথে সরকারি মাইন্ডার বা সহায়ক দল থাকে।


আলেপ্পোতে বিদেশী সাংবাদিকদের জন্য সহায়ক বলতে ছিলেন মাত্র একজন। কাজেই কারো ‘তত্ত্বতালাশ’ ছাড়াই লোকজনের সাথে কথা বলা সম্ভব বোঝাই যায়। অন্য দিকে লাতাকিয়ায় সাংবাদিকদের সাথে ছিলেন একজন মিলিটারি এক্সর্ট। আর হোমসে ছিলেন দু’জন সহায়ক। তবে সরকারি লোকজন যদি সাথে না-থাকে, তবুও এটা বোঝা মোটেই সহজ ছিল না যে, লোকজন যা বলছে তা কি তাদের মনের কথা, নাকি ভয়ের চোটে বানানো কথা।


বিদেশীদেরকে সরকার কী বোঝাতে চায়, সেটা ছিল পরিষ্কার। তারা বোঝাতে চায় : বাশার আল আসাদই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি খণ্ডছিন্ন সিরিয়াকে ফের একীভূত করতে সক্ষম। প্রশ্ন হচ্ছে, দেশটির মানুষও কি এ রকমই মনে করে? পুনরেকত্রীকরণ ও পুনর্গঠনের পথের বাধাগুলো কী কী? বাশার নিজেই কি সবচেয়ে বড় বাধাটি নন?


‘ওরা আসার আগ পর্যন্ত এটা ছিল খুব শান্তির জায়গা’ পা দিয়ে একটি পার্টিকল বোর্ডের এক টুকরো ভেঙে নিয়ে সেটা তেলের ড্রামের জ্বলন্ত আগুনে ছুড়ে ফেলতে ফেলতে বললেন আহমেদ তুবাল, ‘২০১২ সালের রমজান মাসের শুরুতে ওরা এই এলাকায় আসে। আমার বাড়ির সামনেই এক মুখোশ পরা জঙ্গি একটি চলন্ত গাড়ি লক্ষ্য করে ট্যাংকবিধ্বংসী অস্ত্রবর্ষণ করে। নিজের সামনেই দেখি, কিভাবে গাড়ির চার আরোহী আগুনে পুড়ে মারা গেলেন।’ ওদের মরণাপন্ন চেহারাগুলো এখনো তুবালের স্মৃতিকে তাড়া করে বেড়ায়।


তার মনে আছে, তিনি দৌড়ে পাশের দোকানে ঢুকে পড়েছিলেন। কিনেছিলেন রুটি, ডিম, তেল ও চাল। পরের ২০ দিন তার স্ত্রী, দুই সন্তান ও নিজে বাসা থেকে বের হননি। এভাবে একপর্যায়ে সবকিছু শেষ হয়ে এলে তারাও যুদ্ধের সাথে মানিয়ে চলতে শিখে যান।
আলেপ্পো দখলকারী বিদ্রোহীরা বেশির ভাগই এসেছিল আশপাশের এলাকা থেকে এবং তারা নানা দল-উপদলে বিভক্ত ছিল কেউ ছিল উদারপন্থী, কেউবা চরমপন্থী। তবে সময় যতেই গড়াচ্ছিল, তাদের অনেকেই ‘আরো বেশি ধার্মিকে’ পরিণত হচ্ছিল।


তুবাল জানান, তার এলাকায় এসেই বিদ্রোহীরা প্রথমে মদপান ও পরে ধূমপান নিষিদ্ধ করে। তবে এতে তুবালের অসুবিধা কিছু হয়নি। কারণ, ধার্মিক মানুষ হিসেবে এমনিতেই তিনি এসব থেকে দূরে থাকতেন। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পর বিদ্রোহীদের স্থানীয় নেতা যখন কালাশনিকভ রাইফেল কাঁধে জুমার নামাজ পড়তে এলেন, আর সহ্য হলো না আহমেদ তুবালের। ভাবলেন, বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। তিনি মসজিদে যাওয়া ছেড়ে দিলেন। আর ইসলামপন্থীদের হাতে ব্রেইনওয়াশ হওয়া ঠেকাতে সন্তানদের স্কুল থেকে ছাড়িয়ে আনলেন।
তাবুল ও তার চার সঙ্গী যখন আগুন পোহাচ্ছিলেন, তখনো দূর থেকে ভেসে আসছিল বিমান থেকে বোমাবর্ষণের শব্দ। এ সময় ওদের দিকে এগিয়ে এলো বেঁটে খাটো একটা মানুষ।

অনাহারে শুকিয়ে যাওয়া শরীরে চামড়ায় জড়ানো ক’খানা হাড়। লোকটি এসেই প্রথমে খানিকটা হেসে নিলো, তারপর কাঁদতে শুরু করল। তারপর কী যেন বলল, বোঝা গেল না। বলেই বড় বড় চোখ করে আগুনের দিকে তাকিয়ে রইল। একজন বললো, ‘ওর নাম মোহাম্মদ। বিমান হামলার ঘটনায় ওর মাথা খারাপ হয়ে গেছে।’ এরপর লোকটি কিছুক্ষণ ফুঁপিয়ে কাঁদল, আবার হাসতে শুরু করল। তারপর সেখান থেকে বেরিয়ে অন্ধকারে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে মিলিয়ে গেল।


আলেপ্পো মহানগরীর পশ্চিম অংশ বরাবরই ছিল সরকারের দখলে। সেখানে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে অপেক্ষাকৃত কম। কিন্তু পূর্বাংশ, যেখানে অবস্থিত নগরীর ঐতিহাসিক কেন্দ্রস্থল, সেটির দখলে ছিল বিদ্রোহীরা। ওদের তাড়াতে বিমান হামলার ফলে ওই অংশের যে অবস্থা দাঁড়িয়েছে তাতে এখন ওই এলাকাকে ‘যুদ্ধের ধ্বংসলীলার স্মৃতিস্তম্ভ’ ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। বিদ্রোহীরা পালানোর পর সেই ধ্বংসস্তূপে ধীরে ধীরে ফিরছে নগরবাসী। একটা-দু’টো করে খুলছে দোকানপাট। বোমায় ক্ষতবিক্ষত অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকছে বাসিন্দারা এমন দৃশ্য দেখা যায়।
আরো দেখা যায়, রাশান সৈন্যরা বিভিন্ন ভবনের বাইরে বিদ্রোহীদের পেতে রাখা মাইন সরিয়ে নিচ্ছে। ভাঙাচোরা বাস দিয়ে বানানো ব্যারিকেড তুলে ফেলছে।

বিদ্রোহীরা লেজ গোটানোর আগে ছোট ছোট রাস্তার পাশে পেতে গিয়েছিল হোমমেড বোমার ফাঁদ। রাশানরা সেগুলোও অপসারণ করছে। পাশেই দেখা যাচ্ছে শিশুরা গ্যাস ক্যানিস্টার নিয়ে খেলছে। বিদ্রোহীরা এই ক্যানিস্টারগুলোকে গোলায় পরিণত করেছিল।
এই মহানগরে বিদ্যুৎ সরবরাহ নেই। যেটুকু আলো জ্বলে, সেটা পাওয়া যায় জেনারেটর চালিয়ে। রাস্তায় রাস্তায় ছড়ানো রয়েছে ধ্বংসযজ্ঞের আবর্জনা। সব কিছুর ওপরই ছাই ও ধুলোর পরত। তার মাঝেই কখনো কখনো এক-দু’জন মানুষ দেখা যায় দাঁড়িয়ে আছে। সর্বস্ব হারানো, ভাষাহীন, দুঃখী, গন্তব্যহীন মানুষ।


আহমেদ তুবাল যে এলাকার বাসিন্দা, ডিসেম্বর পর্যন্ত সেটি দখল করে ছিল ফাতাহ আল-শাম নামে একটি চরমপন্থী আধা সামরিক বিদ্রোহী গোষ্ঠী। জাতিসঙ্ঘের হিসাবমতে, আলেপ্পোতে যত বিদ্রোহী ছিল, তার ১০ শতাংশ এই দলের। একটি অ্যাপার্টমেন্টের মেঝেতে বড় হরফে লেখা দেখা গেল ‘ফাতাহ দলে যোগ দিন’। অ্যাপার্টমেন্টটির সামনের অংশ নেই। ওপরের অংশও এমন ভাঙাচোরা, দেখে মনে হবে যেন কোনো উন্মাদ দেবতা কুড়াল দিয়ে ইচ্ছেমতো কুপিয়ে চুরমার করেছে।


আহমেদ তুবাল বলেন, ওরা (বিদ্রোহী) কথায় কথায় ‘আল্লাহু আকবর’ বলে হাঁক দিত। যেমন, কোনো দোকানে ঢুকেই হাঁকত ‘আল্লাহু আকবর!’ তারপর দোকানিকে বলত, ‘তুমি তো কাফের।’ বলেই দোকান লুটপাট করে জিনিসপত্র নিয়ে যেত। আবার ধরুন, পথে কোনো নারীকে দেখে ‘পছন্দ’ হলেই তাকে ধরে ফেলত। বলত, ‘তুমি তো পুলিশ অফিসারের স্ত্রী।’ বলেই জবাবের অপেক্ষা না করে তাকে তুলে নিয়ে যেত। যারা নিয়মিত মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ত না, তাদের ১৫ দিনের জেল দিত।’


তিনি বলেন, খুনখারাবি করতে একটুও হাত কাঁপত না ওদের। সিগারেট কেনার সময় একটু কথাকাটাকাটি হতেই ওরা আমার পরিচিত এক সিগারেট বিক্রেতাকে গুলি করে মেরে ফেলে। বাকিতে কফি বিক্রি না করায়ও গুলি করে মারে এক তরুণকে।
তুবাল বলেন, এ দিকে একে একে অনেক বিদেশী যোদ্ধা এসে বিদ্রোহীদের দলে ভিড়তে থাকল। ওদের ভারে সিরিয়ান বিদ্রোহীরাই সংখ্যালঘু হয়ে গেল।

বিজয়ীরাই ইতিহাস লেখে। হয়তো সেই সূত্র অনুসারেই এই এলাকার সবাই দাবি করছে যে, তারা সবাই বিদ্রোহীদের বিপক্ষে ছিল। আর যারা ভিন্ন মত পোষণ করে তারা হয়তো চুপ করে আছে অথবা এলাকাতেই নেই। অবশ্য, এটা ঠিক যে আলেপ্পোতে প্রেসিডেন্টের সমর্থক সবসময় বেশিই ছিল। এ কারণেই বিদ্রোহীদের পলায়নে এখানে স্বস্তিটা একটু বেশি দৃশ্যমান। তাই নগরবাসীর কথা, আমাদের শহরে যুদ্ধ এসেছে বাইরে থেকে। তুবালের কথায়, ‘ওরা (বিদ্রোহী) আমাদের এলাকাটা আমাদের কাছ থেকে চুরি করে নিয়েছিল।’

 

ধারাবাহিক নির্যাতন

সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের শুরুতে আলাভিতে শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াই করছিল বিরোধী সুন্নিরা। আর শাসকগোষ্ঠী গোড়া থেকেই ধরে নিয়েছিল যে, জয়ী হতে হলে চরমপন্থা অবলম্বন করতে হবে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সেই সিদ্ধান্ত অনুসারে শাসকগোষ্ঠী বিমান থেকে বোমা ফেলে লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করে এবং তার ‘সুফল’ পায়। রাজধানী দামেস্কের কাছে সাইদানিয়া সামরিক কারাগারেই শুধু ১৩ হাজার বন্দীকে হত্যা করা হয়। অ্যামনেস্টির প্রতিবেদন অনুসারে, ওই কারাগারে বন্দী নির্যাতন ও ধর্ষণ ছিল নিয়মিত ঘটনা।
শাসকগোষ্ঠী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, পুনরেকত্রীকরণ নয়, ধ্বংসের তাণ্ডব চালিয়েই জয়ী হবে তারা। এবং বাস্তবেও শক্তিশালী মিত্রদের সহায়তায় প্রেসিডেন্ট বাশার সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়েই চলেছেন। তা ঠিক আছে। কিন্তু তার ভবিষ্যৎ কী?

 

লাতাকিয়া

লাতাকিয়া যেতে সময় লাগে পাঁচ ঘণ্টা। অথচ দূরত্ব মাত্র ১৪৪ কিলোমিটার (৮৯ মাইল)। এই পথটুকু পাড়ি দিলেই লাতাকিয়া; সে যেন আরেক দুনিয়া।
সিরিয়ার অন্যান্য অংশের সাথে আলেপ্পোর সংযোগকারী যে একটিমাত্র রাস্তা, সেটি অগুনতি বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি ও সাঁজোয়া যানে বোঝাই। এর খানিক পুব দিকেই ওঁৎ পেতে আছে আইএস জঙ্গিদের দল আর পশ্চিম ভাগ নিয়ন্ত্রণ করছে বাশারবিরোধী বিদ্রোহীরা।
আমাদের গাড়িটি ছুটছে দক্ষিণ দিকে। জাবাল হ্রদের পাড়ে পৌঁছার পূর্ব পর্যন্ত রাস্তায় দু’পাশে চোখে পড়বে সারি সারি গ্রাম। গ্রাম তো নয়, যেন ধ্বংসস্তূপ। জনশূন্য, নীরব। রাস্তার পাশেই আগুন দিয়ে পোড়ানো সাঁজোয়া যান ও বাসের লোহালক্কড়। কোথাও বা পড়ে আছে অবিস্ফোরিত ক্ষেপণাস্ত্র, যেন এইমাত্র আকাশ থেকে নেমে এসেছে। ক্যাকটাসের মতো বন্ধ্যা জমি। কাছের পাহাড়ের চূড়ায় সেনাসদস্যরা বোল্ডার ও বাতিল লোহালক্কড়ের স্তূপ বানিয়ে রেখেছে।


লাতাকিয়ার অবস্থান উপকূলীয় পর্বতমালার ঠিক পেছনেই। এখানে গিয়ে দেখি, সব কিছু আগের মতোই, অর্থাৎ স্বাভাবিক। মানুষ হাঁটছে, ঘুরছে, ফিরছে। সমুদ্রে মাছ শিকারে যাচ্ছে। অনেকগুলো ভ্যাকেশন হোমে নতুন করে রঙ করানো হয়েছে। দোকানপাটেও ভিড়ের কমতি নেই। নগর কর্তৃপক্ষ দোকানপাট খোলা রাখার সময় বাড়িয়ে দিয়েছেন। অনেকের মতে, আলেপ্পো থেকে আসা পর্যটকদের সুবিধার্থেই এটা করা হয়েছে। কারণ, ওই নগরের বাসিন্দাদের অভ্যাস হচ্ছে বেশি রাতে কেনাকাটা করা।


লাতাকিয়া হচ্ছে সিরিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী। তবে এই নগরীর সুখ্যাতি হচ্ছে এর সৈকত এবং বিলাসবহুল হোটেলের জন্য। নগরীটিকে এখন সুরক্ষা দিচ্ছে রাশানরা। এ কাজের জন্য ওরা ২০১৫ সালেই এখানে একটি বিমান ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা করে। গোড়ার দিকে এখানে ক’দিন যুদ্ধ চলেছিল। কিন্তু ওই ক’দিনই। তারপর সব ঠাণ্ডা। কারণ, এটি হচ্ছে ধর্মীয় সংখ্যালঘু আলাভিতে গোষ্ঠীর মূলভূমি। আর প্রেসিডেন্ট বাশার এই গোষ্ঠীরই মানুষ। তার পরিবারই এখানকার অর্থনীতি ও চোরাচালান রুটগুলো নিয়ন্ত্রণ করে। এই শহরের এক দিকে তীব্র দারিদ্র্য, অন্য দিকে অঢেল সম্পদ। সেই সম্পদ দিয়ে গড়ে উঠছে নিত্যনতুন রেস্তোরাঁ, খোলা হচ্ছে ক্যাফে আর আয়োজন করা হচ্ছে উদ্দাম উচ্ছল পার্টির।


অন্য রকম একজন

একটি ফাইভ স্টার হোটেলের লাউঞ্জে বসে ছিলেন ঘাইথ সালমান। মাথার চুল ছোট করে ছাঁটা, পরনে অ্যাডিডাসের হালকা নীল রঙের ট্র্যাক স্যুট, চোখে-মুখে রাগ। ফোঁস ফোঁস করতে করতে বলেন, ‘আমাদের ওপর দুনিয়ার সবার এত রাগ কেন?’


সালমানের ক্ষোভের কারণ আছে। গত বছর নভেম্বরে যখন আলেপ্পোতে বিমান থেকে নির্বিচার বোমা ফেলা হচ্ছিল, মরছিল হাজার হাজার মানুষ, ধ্বংস হচ্ছিল সংখ্যাহীন ঘরবাড়ি, সালমান তখন লাতাকিয়ায় আয়োজন করেন ‘সিরিয়ান ফ্যাশন উইক’। তাতে স্থানীয় মডেলরা তরুণ ডিজাইনারদের করা বিচিত্র পোশাক প্রদর্শন করে। আরব মিডিয়া এই আয়োজনের তীব্র সমালোচনা করে। সে কথা মনে পড়লে এখনো রাগ চড় চড় করে মাথায় ওঠে সালমানের। সেই পুরনো ক্ষোভ থেকেই তীক্ষè গলায় প্রশ্ন করেন তিনি, ‘আলেপ্পো নিয়ে আমার কেন মাথা ঘামাতে হবে?’
হোটেলের লবিতে প্রদর্শিত হচ্ছে গত গ্রীষ্মে তোলা ভিডিওচিত্র লোকে লোকারণ্য সমুদ্রসৈকত, শিশুরা সৈকতের বালি দিয়ে দুর্গ বানাচ্ছে, আলো-আঁধারির মধ্যে নাচছে জোড়ায় জোড়ায় নারী-পুরুষ। সে দিকে তাকিয়ে দেখতে দেখতে সালমান বলেন, ‘পত্রিকাগুলো মিথ্যে বলছে। প্রেসিডেন্ট বাশারের ক্ষতি করতেই মিথ্যে কথা লেখা হচ্ছে। আলেপ্পোয় বোমা ফেলায় যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলা হচ্ছে, সব ভুয়া। সরকারের দুশমনরা এসব কথা বলে বেড়াচ্ছে।’


তথ্য মন্ত্রণালয়ের দু’জন মাইন্ডার (সহায়ক) এতক্ষণ পাশের টেবিলে বসে মনোযোগী ছাত্রের মতো নোট নিচ্ছিলেন। সালমানের কথায় তারাও সম্মতিসূচক মাথা নাড়ালেন। সালমান বললেন, ‘আমাদের বাঁচাতেই সৈন্যরা জীবন দিচ্ছে। আমরা বেঁচে থাকার জন্য তাদের কাছে ঋণী।’
কথা বলতে বলতে ঝুপ করে সন্ধ্যা নেমে এলো। সমুদ্রের হাওয়া জোরদার হয়ে হু হু করে ঢুকতে লাগল। সালমান এবার হাঁটতে শুরু করলেন ক্যাফে মস্কোর দিকে। এই ক্যাফেতে রুশ ক্রেতাদের কোনো টাকা লাগে না। রুশরা এখানে ‘শান্তি’ প্রতিষ্ঠা করেছে, তাই কৃতজ্ঞতাস্বরূপ ক্যাফের মালিক এ ব্যবস্থা করেছেন। ২০১১ সালে জাতিসঙ্ঘে নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাব ওঠে সিরিয়ার ওপর অবরোধ আরোপের। রাশিয়ার ভেটো প্রয়োগের ফলে প্রস্তাবটি নাকচ হয়ে যায়। ক্যাফের মালিক তখন তার ক্যাফের নামকরণ করেন ‘ক্যাফে মস্কো’। বিনিময়ে রুশ সেনাকর্মকর্তারা তাকে একটি ইউনিফর্ম উপহার দেন। সালমান সেটি তার কামরায় রেখে দিয়েছেন এখনো। ছোট্ট ওই কামরাতেই রাত কাটান তিনি আর প্রস্তুতি নেন আইন পরীক্ষার। তার বিশ্বাস, আইন পরীক্ষায় পাস করলেই তিনি একদিন-না-একদিন ঠিকই রাশিয়া চলে যেতে পারবেন।
সত্যিই বিচিত্র। সিরিয়ায় একজন যাকে ভাবে যুদ্ধাপরাধী, আরেকজনের চোখে তিনি মহাবীর। সালমান রাশানদের ভালোবাসেন। ভাবেন, একদিন তাদের (রুশ) মডেল অনুসরণ করে শান্তি নেমে আসবে। সব যুদ্ধবিগ্রহ থেমে সিরিয়ানরা নিজেরাই সব ঠিক করে ফেলতে পারবে। কিন্তু কিভাবে? না, সালমান তা জানেন না।

 

হোমস : একদা ও এখন

সিরিয়া সরকারের সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য কী, তা হোমসে এলে দেখা যায়। জনাকীর্ণ উপকূলের ধার ঘেঁষে, যুদ্ধের ধ্বংসলীলার শিকার হয়নি এমন অক্ষত গ্রামের পর গ্রাম, আঙুরক্ষেত ও গ্রিনহাউসকে পেছনে ফেলে সোজা দক্ষিণ দিকে চলে গেছে মহাসড়ক। বাড়ির ছাদে শুকাতে দেয়া কাপড়চোপড় উড়ছে ভূমধ্যসাগরীয় হাওয়ায়।


মহাসড়কটি চলে গেছে তারতাসকে পাশে রেখে, যেখানে নোঙর করে আছে রাশান নৌবহর। সম্প্রতি সেখানে একটি বিলাসবহুল অবকাশযাপন কেন্দ্রও (রিসোর্ট) খোলা হয়েছে বলে জানা যায়। আলাভিতে গোত্রের যেসব মানুষ এখানে বাস করে, তাদের অনেক ছেলে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে প্রাণ হারিয়েছে। কিন্তু তার পরও এখানে যুদ্ধের চিহ্নমাত্র দেখা যায় না।


মহাসড়কটি এবার মোড় নিয়েছে পুব দিকে। দূর থেকেই দেখা যাচ্ছে বরফের টুপি মাথায় দিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে পর্বতমালা। তাতে সূর্যের আলো পড়ে ঝলমল করছে। যতই আমরা হমসের কাছাকাছি হতে লাগলাম, ততই যেন যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের গভীর খাদে তলিয়ে যেতে থামলাম।
একসময় এই হোমস ছিল সিরিয়ান বিদ্রোহের কেন্দ্রস্থল আর এখন এর তিন ভাগের দুই ভাগ এলাকাই পরিত্যক্ত। ২০১১ সালের মার্চে, দারায় একটি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের পর হোমস শহরে নামে মানুষের ঢল। সিরিয়ান শাসকগোষ্ঠী এর জবাব দেয় নিদারুণ নিষ্ঠুরতায়। জনতাকে রাজপথ থেকে হটাতে তারা ট্যাংক নামায়। তার পরের তিন বছর এই শহর ছিল উত্তপ্ত রণাঙ্গন। অবশেষে ২০১৪ সালের মে মাসে বেশির ভাগ বিদ্রোহীকে শহর ছাড়ার সুযোগ দেয়া হয়। তখন থেকে হোমস শহর বাশার সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ব্যতিক্রম শুধু একটি এলাকা। সেখানে অল্প কিছু বিদ্রোহী লুকিয়ে-চুরিয়ে হলেও ছিল। সম্প্রতি সরকারের সাথে তাদেরও যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছে।


আলেপ্পোর পর সবচেয়ে বড় ধ্বংসযজ্ঞের শিকার এই শহরটি (হোমস)। বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে থাকাকালে এখানে সরকারি বাহিনী এত বেশি বোমা পেলে যে, এই শহরে বাসযোগ্য একটা বাড়িও নেই। যা আছে তা বাড়ির কঙ্কালমাত্র, যা ‘একটুখানি হাওয়া দিলে ঘর নড়বড় করে’। এই শহরকে আবার বাসযোগ্য করার একটামাত্র উপায় আছে, তা হলো একে পুরোপুরি ধ্বংস করে পুনর্নির্মাণ করা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ড্রেসডেন অথবা স্তালিনগ্রাদকে যেমনটা করা হয়েছিল।


জাতিসঙ্ঘের একটি কর্মসূচির সহায়তা নিয়ে শহরটি পুনর্নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে সিরিয়া সরকার। দেশটিতে জাতিসঙ্ঘের এ ধরনের কর্মসূচি এটাই প্রথম। কর্মসূচির নেতৃত্ব দিচ্ছেন ঘাসান জানসিজ আর তার কয়েকজন উপদেষ্টার একজন হচ্ছেন তারই স্ত্রী, স্থপতি সারওয়া আল-সাবৌনি (৩৫)। পাতলা চামড়ার জুতো পায়ে এই নারী ঘুরে বেড়ান এই ঐতিহাসিক শহরের কেন্দ্রস্থলে, যেখানটা একদা মানুষের উপস্থিতিতে মুখর থাকত আর এখন চার দিক ফাঁকা, গোরস্থানের মতোই নির্জন।

 

মৃত্যুর ছাইয়ের ভেতর

মারওয়ার সাথে হাঁটছিলাম আমরা। প্রবল বোমাবর্ষণ সয়েও মাথা উঁচু করে আছে এক-দু’টি রোমান বাথের (স্নানাগার) গম্বুজ। মারওয়া খুউব সাবধানে পা ফেলে একটিতে ঢুকলেন। ঢুকেই ছোট একটি কামরায় থমকে দাঁড়ালেন। কামরাটির মেঝে আনুমানিক ৩০ সেন্টিমিটার পুরু ছাইয়ে ঢাকা। কাঠের চেয়ার-টেবিল-বেঞ্চ এবং মানুষের পোড়া লাশের ছাই। কয়েক ডজন পোড়া লাশ এদিক-ওদিক ছড়িয়ে আছে। আর আগে না বাড়িয়ে বেরিয়ে এলাম।


সিরিয়া সরকার চাচ্ছে, হোমস হোক সিরিয়ার নতুন সূচনার প্রতীক, মৃত্যুর ছাই থেকে এখানে বিকশিত হোক নতুন জীবন।
কিন্তু তা কি সম্ভব, কিভাবে? এসব পরিকল্পনার সাফল্য নিয়ে এমনকি মারওয়া নিজেও ঘোরতর সংশয়ী। তার কথা, এই নগরীর রয়েছে বিপুল অর্থসঙ্কট। অনেক পরিবার বহু দূরে কোথাও চলে গেছে এবং সেখানেই সংসার সাজিয়ে বসেছে।


ভুল বলেননি মারওয়া। লোকজন এখানে ‘নতুনভাবে সব কিছু শুরু করতে’ ভয় পাচ্ছে। কেন ভয়, কিসের ভয়? মারওয়া ব্যাখ্যা করেন, এখানে সব কিছুর ওপর নজরদারি চলছে এবং তাই সবাই অন্যের ‘উদ্দেশ্য’ নিয়ে সন্দিহান। শুধু হোমস শহরে নয়, সারা দেশের কোথাও কেউ জানে না ‘কী আছে সরকারের মনে’।


শহরের পুরনো অংশ ছেড়ে মারওয়া এবার হাঁটতেশুরু করেন খালিদিয়ার দিকে। ২০১৩ সালের জুলাই মাসে প্রচণ্ড এক যুদ্ধের মাধ্যমে বিদ্রোহীদের কাছ থেকে এই এলাকাটি পুনর্দখল করে সরকারি বাহিনী। সে দিকে হাঁটতে হাঁটতে মারওয়া বলছিলেন তার হারানো দিনের কথা। বলছিলেন, প্রায় পাঁচ বছর আগে একদিন যুদ্ধ যখন আমাদের এলাকায় এসে হাজির, তখন আমি আমাদের বাসার লিভিংরুমে বাচ্চাদের সাথে খেলছিলাম। এ সময় হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দে আমাদের বাসার সামনে বিস্ফোরিত হলো একটি মর্টার শেল। সব থেমে গেলে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাই। দেখি, ১০ মিনিট আগেই যেখানে আমার মেয়ের বান্ধবীরা একটি দেয়ালে বল ছুড়ে-ছুড়ে খেলা করছিল, এখন তারা সেখানে শুয়ে আছে; মৃত।

 

নিঃসীম নীরবতা

মারওয়া সেই দিনটির কথা তিনি কখনো ভুলতে পারবেন না। ওই দিনের পর থেকে লোকজন এলাকা ছেড়ে চলে যেতে শুরু করে। মারওয়ার অ্যাপার্টমেন্ট থেকে কয়েক ব্লক দূরেই প্রায় প্রতিদিন যুদ্ধ চলে। কিন্তু তারা দীর্ঘ আড়াই বছর নিজেদের বাসা থেকে কোথাও যাননি। সন্তানদের ভয় কাটানোর জন্য তিনি তাদের বলতেন বোমাবর্ষণকারীদের চলার পথ কোনগুলো, কারা গুলি করে, কোথায় কোথায় করে ইত্যাদি। বোমা-গোলার শব্দে ছেলেমেয়েরা অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। এর মাঝেই তারা মোমবাতির আলোয় লেখাপড়া করত, মারওয়া লিখে চলতেন তার ডক্টরাল থিসিস। জানালা খুললেই যেসব ঐতিহাসিক স্থাপত্য নিদর্শনকে কোনো-না-কোনো দিন বোমার ঘায়ে চুরমার হয়ে যেতে দেখতেন, সেই ইসলামি স্থাপত্যকলাই তার গবেষণার বিষয়।


খালিদিয়ার পুরনো চত্বরে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকাতে তাকাতে হাঁটছিলেন মারওয়া। অবিশ্বাস তো হবেই। যেখানে একসময় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকত সুউচ্চ ভবন, সেখানে এখানে ইট কাঠ-পাথরের স্তূপ। অ্যাশফল্টের ফাটল দিয়ে দেখা যাচ্ছে ঘাসের ডগা। আর চার দিকে নিঃসীম নীরবতা।


কয়েক ব্লক পার হতেই দেখা মিলল হিসাম জাবুরের। নিজেদের পুরনো বাড়িতে ফিরে এসেছেন তিনি। বাড়ির নিচতলার দু’টি ছোট্ট কামরাকে কোনোমতে বাসযোগ্য করে সেখানেই থাকছেন। ১২ বর্গমিটার (১৩০ বর্গফুট) আয়তনের এই জায়গাটিতে আছে কয়েকটি সোফা, কয়েকটি সরু ম্যাট্রেস এবং একটি গ্যাস স্টোভ। তার ছেলেমেয়েরা দোতলার ধ্বংসস্তূপের ভেতর একটি সাদা ইঁদুরকে কী যেন খাওয়াচ্ছে। তথ্য মন্ত্রণালয়ের যে ‘সহায়ক ব্যক্তি’টি আমাদের সাথে ছিলেন, তিনি হিসাম ও তার স্ত্রীকে চেনেন। জানেন যে, হিসামের স্ত্রী সাংবাদিকদের তাদের ভাঙা বাড়ি দেখাতে পছন্দ করেন।


হিসাম ও তার স্ত্রী শেখানো বুলির মতো গড় গড় করে আওড়ে গেলেন যে তথাকথিত পুনরেকত্রীকরণ চুক্তি (যে চুক্তি বলে বিদ্রোহীরা ২০১৪ সালের মে মাসে শহর ছাড়ে) নিয়ে তারা সন্তুষ্ট। হিসাম আরো বলেন, ‘ওরা (বিদ্রোহী) আমাদের দেশটাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। এ অপরাধের ক্ষমা নেই। যুদ্ধের আগে সবাই সুখে-শান্তিতে ছিল। এই যুদ্ধের কোনো যুক্তি ছিল না।’


হিসামের কথায় কিন্তু পুরোপুরি একমত হলেন না মারওয়া। অবশ্য ওদের সামনে দ্বিমত প্রকাশ করেননি তিনি। কয়েক ব্লক দূরে এসে বললেন, ‘আসলে হয়েছে কী, লোকজন তা-ই বিশ্বাস করে যা তারা বিশ্বাস করতে চায়। অতীত নিয়ে আমার অভিজ্ঞতা কিন্তু ধোঁয়াটে। ঠিক এ রকম, যেন যুদ্ধের আগের সব কিছুর ওপর কুয়াশা ছড়িয়ে আছে।’ একটু থেমে ফের বলেন, ‘যুদ্ধের আগে সব কিছু ভালো ছিল, এটা মোটেই ঠিক নয়।’ বোঝা গেল, এই নারী স্থপতি হারানো বছরগুলোকে রোমান্টিক চোখে দেখেন না, যেমনটা দেখছেন অনেক সিরিয়ান। এ নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সাথে তার মতপার্থক্য আছে।


মতপার্থক্য আছে হোমস নগর সরকারের ভেতরও। একদল চায় এই পুরনো শহরটি এখন যেমন আছে তেমনই থাকুক, কেউ এর পাথর, ছাই, বুলেট ক্যাসিং, মৃত মানুষের কঙ্কাল ও বিপুল ধ্বংসস্তূপে হাত পর্যন্ত না ছোঁয়াক। তারা চায়, এ সবই এক নির্মম অতীতের স্মৃতি হয়ে টিকে থাকুক, যেন বলা যায় : ‘তোমরা তোমাদের শহরকে বিদ্রোহীদের হাতে তুলে দিয়েছিলে, এখন এর পরিণামের ভেতর বেঁচে থাকো।’
এদের সাথেও একমত নন মারওয়া। তার বিশ্বাস, পুনরেকত্রীকরণের পথে এগোনোর একটি বড় পদক্ষেপ হলো পুনর্গঠন। তিনি বলেন, যুদ্ধের কারণে এই নগরীরর যে ক্ষতি হয়েছে তা মুছে ফেলতে হবে, যাতে অন্যান্য ক্ষতও সারানো যায়। বিভিন্ন ধর্ম ও গোত্রের মধ্যে যে ফাটল সৃষ্টি হয়েছে, তাকে জোড়া লাগাতে স্থাপত্যকলাকে অবশ্যই অবদান রাখতে হবে।


‘কিন্তু ভয়ঙ্কর সহিংসভাবে বিভক্ত একটি সমাজকে কি স্থাপত্য দিয়ে পুনরেকত্রিত করা যায়?’ এমন প্রশ্নে এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলেন মারওয়া। তারপর বললেন, দেশ পুনর্গঠনে লাগবে সবার মিলিত ইচ্ছা। সমাজের ধারণাটি এখন সিরিয়া থেকে বিলীন হয়ে গেছে। অবশ্য যুদ্ধের আগেও কোনো অভিন্ন সিরিয়ান আইডেনটিটি ছিল না। গোত্রে গোত্রে বিভাজন সব সময়ই ছিল, যদিও প্রতিবেশী অনেক দেশের চেয়ে অনেক কম।


হোমস শহরটি ছিল দামেস্কের চেয়েও রক্ষণশীল। বিভিন্ন ধর্মের মানুষ এখানে আপন বলয়ে ব্যস্ত থাকত। কিন্তু এই শহরের একটা বড় গৌরবময় অর্জন ছিল, যা নিয়ে শহরটি তো বটেই, এমনকি গোটা সিরিয়াও গর্ব করতে পারত। তা হলো : সব কিছুর ঊর্ধ্বে মানুষ এখানে শান্তিতে বসবাস করতে পারত।


কিন্তু এখন হোমসে ‘ধর্মীয়’ উত্তেজনা অনেক বেশি। ধ্বংস হয়ে যাওয়া শহরে সব মানুষকে আপন আপন বাড়িতে ফিরতে দেয়া হচ্ছে না। বিশেষ করে সুন্নিরা পড়ছে সবচেয়ে বেশি বাধার মুখে। কারণ, তাদের বড় অংশই ছিল বিদ্রোহীদের সমর্থক। সরকারের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি সরকারপন্থী মিলিশিয়ারাও সুন্নিদের ঘরে ফেরায় বাধা দিয়ে চলেছে।


তারপরও যারা ফিরতে চায়, তাদের যেতে হচ্ছে যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায়। সেখানে কাউকে যদি ‘বিদ্রোহীদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল’ এমনও পাওয়া যায়, তো তার আর ফেরা হবে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি বলেন, এই ভয়ে অনেকে ফিরে আসার দরখাস্ত দিতেই ভয় পাচ্ছে।


বোঝাই যায়, ধর্মীয় নির্মূল অভিযান ও স্বধর্মীদের প্রত্যাবাসনই চলবে এখানে। হোমস পুনর্গঠনে যেসব পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে, তাতে সেই সব মানুষের কোনো স্থানই হয়নি, যারা একদিন নিজেদের অধিকার আদায়ের দাবিতে রাজপথে নেমেছিল। সুন্নিরা একে তাদের ওপর বাশার সরকারের আরেক ধরনের সাজা হিসেবে দেখছে।


তবে হোমসের গভর্নর তালাল আল-বারাজাই কিন্তু কোথাও কোনো সমস্যা দেখছেন না। প্রেসিডেন্ট বাশারের কট্টর সমর্থক এই মানুষটির মুখে সবসময় লেগে আছে মৃদু হাসি। তার সাথে আমাদের সাক্ষাৎ হয় তার দফতরে। তিনি বলেন, লোকজন অস্ত্র সমর্পণ করে, যাচাই প্রক্রিয়াশেষে ফিরতে তো পারছেই। যারা কোনো ‘শাস্তিযোগ্য অপরাধ’ করেনি, তাদের ফিরতে দেয়া হচ্ছে।


প্রশ্ন হলো, ‘শাস্তিযোগ্য অপরাধ না করা’ কথাটির আসল মানেটা কী? বিদ্রোহী ও তাদের সমর্থকেরা কারাবাস, নির্যাতন ও প্রাণদণ্ডের ভয়ে ভীত। এর বাইরে সবচেয়ে ‘ভালো শাস্তি’টি হলো, ইচ্ছার বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীতে কাজ করা।


সিরিয়া সরকারের ‘যুক্তি’ হলো, পুনরেকত্রীকরণ ও নির্মূলকরণ পরস্পর একসূত্রে গাঁথা। তাই শত্রুকে বিনাশ করলেই দেশে শান্তি আসবে। সরকার আরো মনে করে, প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের বিরুদ্ধে গণ-অভ্যুত্থানটি সমাজের ভেতর থেকে উত্থিত হয়নি, এটি নেহাতই ‘সন্ত্রাসীদের’ কাজ।


সিরিয়ায় একটা কথা প্রচলিত আছে : একটি মিথ্যাকে বার বার বলতে থাকলে একসময় সেটিই সত্য রূপে পরিগণিত হয়। বাশার আল আসাদ সরকারের ‘সহায়কদের’ সাথে নিয়ে সিরিয়া সফরকালে দেখেছি, অনেক সিরিয়ানই তাদের মনের কথাটি আমাদের বলেনি, সেটি চাপা থেকে গেছে ভয়ের নিচে। তা ছাড়া প্রতিপক্ষের দুঃখদুর্দশার চিত্রটিও আমরা দেখতে পাইনি। আমাদের দেখানো হয়েছে, বাশার সরকার যুদ্ধজয়ে সক্ষম। কিন্তু পুনরেকত্রীকরণের আভাসমাত্র দেখতে পাইনি আমরা। যেসব মানুষ ছয় বছর আগে রাজপথে নেমেছিল, বিদ্রোহ করেছিল এমন এক শাসকের বিরুদ্ধে, যিনি তার প্রতিপক্ষের ওপর ক্রমাগত নির্যাতন চালিয়ে গেছেন, নিজ দেশের মানুষকে কথা বলতে দেননি, আজ সেই সব মানুষের স্থান কোথাও নেই।


অনেক সরকার সমর্থককেও দেখেছি সহাবস্থানের পক্ষে কথা বলতে, যা নাকি সিরিয়ায় একসময় ছিল। কিন্তু সরকার বিদ্রোহীদের উৎখাত করা ছাড়া আর কিছুই ভাবে না।


হোমসের গভর্নর তালাল আল-বারাজাইর কথায় ফিরে যাই। তিনি বলেন, যে দেশটি নানা ধর্ম বর্ণ গোত্র নিয়েই হাজার বছর ধরে একসাথে থেকেছে, ১০ বছরের যুদ্ধ সেই জাতিকে ছিন্নভিন্ন করতে পারে না। সে দিন বেশি দূরে নয়, যে দিন সব কিছু আবার যুদ্ধের আগের মতোই চমৎকার হয়ে যাবে। সবাই শান্তিতে পাশাপাশি বসবাস করবে।
তার কথাই সত্য হোক। শান্তির অমিয় ধারা নেমে আসুক অশান্ত সিরিয়ায়।